“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৫।। সৌদি আরব কেন হুতিদের হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে, নেপথ্যে ১০ কারণ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৫।। সৌদি আরব কেন হুতিদের হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে, নেপথ্যে ১০ কারণ

উৎসর্গ


“যাঁরা অস্ত্রের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও স্থায়ী শান্তিতে বিশ্বাস করেন, তাঁদের প্রতি”

প্রতিরক্ষা খাতে বছরে ৮৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও সৌদি আরব কেন হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না? এর কারণ শুধু অস্ত্রের ঘাটতি নয়। বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি শনাক্ত করা এবং তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জটিলতা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে রয়েছে হুতিদের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইয়েমেনের দুর্গম ভূপ্রকৃতি।

কারা এই হুতিরা, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত কেন?

হুতিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে শিকড় গাড়া একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন। তাদের ভিত্তি দেশটির জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে। আন্দোলনটির নাম এসেছে এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম থেকে। ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হুতিরা দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

২০১৫ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মনসুর হাদি দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেওয়ার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। সৌদি আরবের আশঙ্কা ছিল, ইয়েমেনে হুতিদের প্রভাব বাড়লে তার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে। অন্যদিকে, হুতিরা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানকে নিজেদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে দেখে। এভাবেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়।

ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইয়েমেনে ইরানি উৎসের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের নিদর্শন পাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে হুতিদের কেবল ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে দেখলে ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তাদের নিজস্ব লক্ষ্য উপেক্ষিত হয়। দীর্ঘ যুদ্ধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতকে জিইয়ে রেখেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলার সক্ষমতা এই বিরোধকে আরও জটিল করেছে।

সৌদী আরব হুতিদের মোকাবেলা না করতে পারার পেছনে যেসব কারণ বিদ্যমান সেগুলো হচ্ছে:

১. বিশাল ভূখণ্ড, অগণিত লক্ষ্যবস্তু

সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, পাইপলাইন, বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনা ছড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একযোগে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। একটি স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করতে গিয়ে অন্য কোথাও দুর্বলতা থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় একসঙ্গে বহু লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষার চাপ তৈরি হয়।

২. নানা ধরনের অস্ত্রে একযোগে হামলা

হুতিরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দূরপাল্লার ড্রোনও ব্যবহার করে। প্রতিটি অস্ত্রের গতি, উড্ডয়নপথ ও আঘাতের ধরন আলাদা। ফলে সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করতে হয়। একটি নির্দিষ্ট অস্ত্র মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা অন্য ধরনের হামলার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নাও হতে পারে।

৩. রাডারে দেরিতে ধরা পড়ার ঝুঁকি

নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হতে পারে। সতর্কবার্তা পেতে দেরি হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমে যায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার এই সীমিত সময়ের মধ্যেই হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

৪. সস্তা ড্রোন, ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা

তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে আক্রমণকারী কম খরচে প্রতিরক্ষার ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। প্রতিটি হামলা ঠেকাতে দামি অস্ত্র ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে সৌদি আরবকে শুধু হামলা প্রতিহত নয়, অস্ত্র ব্যবহারের ব্যয় ও কার্যকারিতার হিসাবও করতে হয়।

৫. ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

ইয়েমেনে ইরানি উৎসের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের নিদর্শন পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়। তবে হুতিদের সব কর্মকাণ্ডকে শুধু ইরানের নির্দেশের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও স্বার্থও রয়েছে।

৬. ইয়েমেনের দুর্গম ভূপ্রকৃতি

ইয়েমেনের পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চল অস্ত্র লুকানো, অবস্থান পরিবর্তন এবং সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা শনাক্ত করা বা স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেওয়া কঠিন হয়। প্রতিপক্ষের অস্ত্র ও অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে শুধু পাল্টা হামলা চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন।

৭. অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষারও সীমা আছে

সৌদি আরবের হাতে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। হামলা শনাক্ত করা, লক্ষ্য অনুসরণ করা এবং সময়মতো প্রতিরোধী অস্ত্র ছোড়া—প্রতিটি ধাপেই ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকে। প্রতিপক্ষের অস্ত্রের ধরন ও হামলার পরিস্থিতি বদলালে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতাও বদলাতে পারে।

৮. প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের চাপ

বারবার হামলা হলে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসে এবং তা পুনরায় সংগ্রহের প্রয়োজন হয়। নতুন অস্ত্রের সরবরাহ ও মজুত পূরণে সময় লাগতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে তাই প্রতিরোধী অস্ত্রের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি হুমকির বিরুদ্ধে কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণও প্রতিরক্ষার বড় কৌশলগত অংশ।

৯. দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা

বছরের পর বছর সংঘাতে টিকে থেকে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষার ধরন বুঝে কৌশল বদলানোর সুযোগও তাদের রয়েছে। তাদের কিছু অস্ত্র বা স্থাপনা ধ্বংস করা গেলেও হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। এ কারণে সাময়িক সামরিক সাফল্যকে স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না।

১০. সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন

সামরিক শক্তি দিয়ে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব, কিন্তু সৌদি আরব ও হুতিদের বিরোধের রাজনৈতিক কারণ দূর করা যায় না শুধু অস্ত্রের জোরে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিরাপত্তা নিয়ে অবিশ্বাস এবং পাল্টাপাল্টি দাবির অবসান না হলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি যুদ্ধবিরতি, আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজাও জরুরি।

অস্ত্রের শক্তি, নাকি সংঘাতের সমাধান?

সৌদি আরবের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উন্নত অস্ত্র হামলার ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু সব হুমকি নির্মূল করতে পারে না। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, প্রতিরোধী অস্ত্রের ব্যয় এবং দীর্ঘ সংঘাত—সব মিলিয়ে হুতিদের মোকাবিলা করা জটিল হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা সমন্বয়, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। কারণ অস্ত্র হামলার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে, কিন্তু বিরোধের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকলে নিরাপত্তার সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,  ১৬ অক্টোবর, ২০২৬