তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
পত্রিকার সম্পাদক হতে স্নাতক ও ১০ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক: প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৪ অক্টোবর :
সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদান, সংবাদ প্রকাশের দায়ে আর্থিক জরিমানা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ওপর নজরদারির ক্ষমতা চায় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। একই সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পাদক হতে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ১০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিলের এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের সাংবাদিকতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সম্পাদকীয় দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন এবং ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন সংশোধনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হলেও সেগুলো নিয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়নি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নিবন্ধন ও সনদ চালুর পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকদের তথ্য নিয়ে একটি অনলাইন ডেটাবেজ তৈরির কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিকতার নামে প্রতারণা ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার ঠেকানো এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধনের যোগ্যতা, স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি এবং নতুন ব্যবস্থায় পেশায় প্রবেশের সুযোগ সম্পর্কে প্রস্তাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো সংবাদ প্রকাশের কারণে সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানা করার ক্ষমতা। মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সংবাদ, সাংবাদিকতার নীতিমালা লঙ্ঘন এবং জনরুচির পরিপন্থি প্রকাশনার অভিযোগে এই ক্ষমতা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে প্রেস কাউন্সিল অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিককে সতর্ক, ভর্ৎসনা কিংবা নিন্দা জানাতে পারে; আর্থিক জরিমানা করার ক্ষমতা নেই।
প্রেস কাউন্সিলকে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা দেওয়া, জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারককে কাউন্সিলের সদস্য করা এবং জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর সংবাদ, গুজব ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের অভিযোগে নিজ উদ্যোগে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণের পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ও নিউজ পোর্টালকেও কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগ তদন্ত এবং তাঁদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনের কারণে মামলার মুখে পড়া সাংবাদিকদের আইনি সহায়তা দিতে পৃথক সেল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
সম্পাদক নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন যোগ্যতার শর্ত আরোপের পাশাপাশি সংবাদপত্রের মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগপত্র ছাড়া সাংবাদিক নিয়োগ কিংবা নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের অন্তত তিন মাসের বেতন-ভাতা দিতে ব্যর্থ হলে সংবাদপত্রের ঘোষণাপত্র বাতিলের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও বেতন-ভাতা নিয়ে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাও চায় কাউন্সিল। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত শ্রম আইনের সঙ্গে এখতিয়ারগত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত তালিকাভুক্ত সংবাদপত্রের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা, নিয়মিত প্রকাশনা তদারকি এবং সংবাদপত্রের কার্যালয় পরিদর্শনের ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। প্রেস কাউন্সিলের স্বাধীনতা বাড়ানো, ঢাকার বাইরে শাখা কার্যালয় স্থাপন, গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য পৃথক সেল গঠন এবং সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হারে অর্থ আদায়ের প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রস্তাবের বিশ্লেষণে বলা যায়, সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও পেশাগত যোগ্যতা নির্ধারণের উদ্যোগের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ‘মিথ্যা’, ‘হয়রানিমূলক’ কিংবা ‘জনরুচির পরিপন্থি’ সংবাদ নির্ধারণের মানদণ্ড স্পষ্ট না হলে এসব ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বাধীন আপিলব্যবস্থা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশ্লেষকদের।
প্রস্তাবগুলো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এসব প্রস্তাব কার্যকর হবে না।