ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা-সহকারীরা কে কোথায়, কী দায়িত্বে, কোথায় অফিস করেন?

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা-সহকারীরা কে কোথায়, কী দায়িত্বে, কোথায় অফিস করেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ভয়েস অব পিপল :

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের একটি বড় দল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্ব পালন করছে। রাজনৈতিক পরামর্শ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান—সরকারের বিস্তৃত কর্মপরিধির নানা অংশে তাঁদের দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে। কেউ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কাজ তদারক করছেন, কেউ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও নীতিগত পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করা, বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতি আনতেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বিচার করতে হলে শুধু পদমর্যাদা বা সংখ্যা নয়, তাঁদের প্রকৃত দায়িত্ব, কাজের ফলাফল, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সরকারি ব্যয়ের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মন্ত্রীর পদমর্যাদায় ছয় উপদেষ্টা

মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ—রাজনৈতিক উপদেষ্টা: বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা আব্বাস প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁর জন্য দপ্তর ও প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দ রয়েছে। তিনি অসুস্থ থাকায় নিয়মিত কার্যালয়ে যেতে না পারলেও তাঁর দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান—রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে: বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য নজরুল ইসলাম খান রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষি খাতের নীতি, উৎপাদন, কৃষকের স্বার্থ ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তাঁর দপ্তর প্রস্তুতের কাজ চলছে।

রুহুল কবির রিজভী—রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে: বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা রুহুল কবির রিজভী রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্প খাতের নীতি, উৎপাদন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট বিষয় তাঁর কাজের পরিধির অন্তর্ভুক্ত। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দপ্তর বরাদ্দ আছে।

মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ইসমাইল জবিউল্লাহ জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি প্রশাসনের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক সংস্কার ও জনবল ব্যবস্থাপনা এ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্র। তিনি সচিবালয়ের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর—অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা: অর্থনীতি ও পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাঁর জন্য নির্ধারিত দপ্তর ও জনবল রয়েছে।

জহির উদ্দিন স্বপন—রাজনৈতিক উপদেষ্টা: বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা জহির উদ্দিন স্বপন ২০২৬ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁর দায়িত্ব রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া এবং সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা। তিনি তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ করেন।

প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় চার উপদেষ্টা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম—প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ: প্রতিরক্ষা খাতের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা, সশস্ত্র বাহিনী-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং এ খাতের নীতিগত বিষয়ে তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর দপ্তর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ।

ড. মাহ্‌দী আমিন—চার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র: শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান—এই চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁর ওপর রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে শিক্ষানীতি, প্রাথমিক শিক্ষা, বিদেশে কর্মসংস্থান, প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ এবং শ্রমবাজার-সংশ্লিষ্ট বিষয় তাঁর দায়িত্বের আওতায় রয়েছে। সরকারের অবস্থান ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানানোর কাজও তাঁর ভূমিকার অংশ।

রেহান আসিফ আসাদ—ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডাকব্যবস্থা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের নীতিগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।  সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে তাঁর দপ্তর।

ডা. জাহেদ-উর রহমান—নীতি ও কৌশল, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি: পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত। সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারকির সঙ্গে তাঁর কাজ সম্পর্কিত। সচিবালয়ের ছয় নম্বর ভবনে তাঁর দপ্তর রয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমকে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করেন।

উপদেষ্টাদের দায়িত্বের ধরন থেকে বোঝা যায়, তাঁদের কেউ রাজনৈতিক পরামর্শ দেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়া আর কোনো খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা এক বিষয় নয়। তাঁদের কার্যকারিতা মূল্যায়নে দায়িত্ব গ্রহণের পর নেওয়া সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও জনস্বার্থে অর্জিত ফলাফল দেখা জরুরি।

বিশেষ সহকারীরা কোন দায়িত্বে

উপদেষ্টাদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীরা নির্দিষ্ট খাতের কাজ ও আন্তদপ্তর সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের পদমর্যাদা এক নয়; কেউ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়, কেউ সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ পেয়েছেন।

বিজন কান্তি সরকার—সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী: প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিষয়গুলোতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমস্যা, অধিকার ও নীতিগত বিষয় তাঁর দায়িত্বের ক্ষেত্র।

তানভীর শাহরিয়ার গনি—বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী: প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বিনিয়োগ পরিবেশ, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট নীতিগত বিষয় নিয়ে কাজ করেন। এ দায়িত্বের গুরুত্ব নির্ভর করবে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন ও পুঁজিবাজারে আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতির ওপর।

ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার—স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী: প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করছেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবার মান, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যা ও নীতিগত সমন্বয় এ দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাঁর দপ্তর সচিবালয়ের পুরোনো এক নম্বর ভবনে।

ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান—এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী: সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থান, বিদেশি শ্রমবাজারের সুযোগ এবং এ-সংক্রান্ত সরকারি সমন্বয় তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও তাঁর জন্য দপ্তর আছে।

ড. মো. সাইমুম পারভেজ—পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী: পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়ে কাজ করেন তিনি। পরিবেশগত ঝুঁকি ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয় তাঁর দায়িত্বের ক্ষেত্র। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে তাঁর দপ্তর আছে।

সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ—যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী: তরুণদের কর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগের বিষয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন, কাজের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মসূচির সমন্বয় এ দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দপ্তর রয়েছে ।

মো. রাশেদ খাঁন—প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী: সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয় তাঁর দায়িত্বের অংশ। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গণমাধ্যমে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা। তবে তাঁর আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে রাজনৈতিক বক্তব্য বা জনসমক্ষে ভূমিকার মূল্যায়ন করতে হলে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গিয়াস উদ্দিন রিমন—বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক বিশেষ সহকারী: সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী হিসেবে দুটি খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সমন্বয় ও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দপ্তরের জন্য সচিবালয়ের ছয় নম্বর ভবনে স্থান নির্ধারণের পরিকল্পনা আছে।

বিশেষ সহকারীদের দায়িত্বের পাশাপাশি ইনভেস্ট বাংলাদেশ চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রয়েছেন। তাঁদের পদ ও দায়িত্বের প্রকৃতি উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীদের থেকে আলাদা; তাই তাঁদের একই শ্রেণিতে ফেলে দেখা উচিত নয়।

তাঁদের কাজের ধরন কী ?

উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সবার দপ্তর একই জায়গায় নয়। কেউ তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, কেউ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে, আবার কেউ দায়িত্বসংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরে বসেন। দপ্তর ও জনবল বরাদ্দ তাঁদের কাজের প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করে। তবে কোনো কর্মকর্তা কোথায় বসেন, তা দিয়ে তাঁর কাজের কার্যকারিতা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নীতি ও কর্মসূচির সমন্বয় করা, মন্ত্রণালয়গুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং বিশেষায়িত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মতো কাজ উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের দায়িত্বের অংশ হতে পারে। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রজ্ঞাপন, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধি দিয়ে।

বিশেষ করে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কাজের অগ্রাধিকার, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকলে সমন্বয় সহজ হতে পারে; আবার কাজের চাপ ও দায়িত্বের বিস্তৃতির কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতাও তৈরি হতে পারে। বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

৭১ জনের হিসাব: মন্ত্রিসভা আর বৃহত্তর প্রশাসনিক দল এক নয়

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সমমর্যাদার উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সম্মিলিত সংখ্যা ৭১ জন। এ সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কয়েকটি শ্রেণি আলাদা রাখা জরুরি। মন্ত্রিসভার সদস্য, মন্ত্রীর বা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী এবং সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা একই সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক অবস্থানে নেই।

তাই ৭১ জনকে সরাসরি মন্ত্রিসভার আকার বলা সঠিক হবে না। বরং এটি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন পদমর্যাদার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একটি সম্মিলিত হিসাব—প্রতিবেদনের তথ্যকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা যুক্তিসংগত।

সংবিধান ও সরকারি বিধিতে তাঁদের অবস্থান

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয় এবং মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ। অন্যদিকে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের নিয়োগ, দায়িত্ব ও কাজের পরিধি নির্ধারণে প্রযোজ্য সরকারি বিধি এবং নিয়োগসংক্রান্ত আদেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: মন্ত্রীর বা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা পাওয়া মানেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রিসভার সদস্য হয়ে যান না। পদমর্যাদা, সাংবিধানিক অবস্থান এবং নির্বাহী ক্ষমতা আলাদা বিষয়। একইভাবে, কোনো উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীকে নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ বা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট আদেশে স্পষ্ট ক্ষমতা না থাকলে তাঁকে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ নির্বাহী কর্তৃত্বসম্পন্ন মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশগ্রহণের বিষয়টিও দায়িত্ব ও প্রযোজ্য আদেশের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীদের মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিয়মিত অংশগ্রহণের জন্য আলাদা সাধারণ আদেশ জারি হয়নি; তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো বিষয় আলোচনায় থাকলে বিশেষ আমন্ত্রণে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অতএব, কারও দায়িত্বের তালিকা থেকে তাঁর আইনগত ক্ষমতা সম্পর্কে অনুমান না করে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রজ্ঞাপন ও দায়িত্ব বণ্টনের সরকারি আদেশ দেখা প্রয়োজন। একইভাবে, তাঁদের কাজের মূল্যায়নে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দায়িত্ব পালনের ফলাফল, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কতটা, মূল্যায়ন হবে কীভাবে

সরকারের কাজের গতি বাড়াতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিশেষ দায়িত্বশীল নিয়োগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ, পরিবেশ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মতো জটিল ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা কাজে লাগানোও যৌক্তিক হতে পারে।

কিন্তু এত সংখ্যক পদ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হলে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের প্রত্যেকের দায়িত্ব কি লিখিতভাবে নির্ধারিত? মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মধ্যে কাজের সীমারেখা কতটা পরিষ্কার? একই বিষয়ে একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেন? তাঁদের দপ্তর ও জনবলের ব্যয় কত? আর নিয়োগের পর জনগণের সেবা, নীতির বাস্তবায়ন বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে কী পরিমাপযোগ্য উন্নতি হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলো শুধু সমালোচনার জন্য নয়; বরং সরকারি কাঠামোর কার্যকারিতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ, কাজের অগ্রগতি প্রকাশ এবং ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বড় প্রশাসনিক কাঠামোও কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে দায়িত্ব অস্পষ্ট থাকলে একই কাঠামোতে সমন্বয়ের বদলে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের কাজ তাই কেবল তাঁদের পদবি, মর্যাদা বা কার্যালয়ের অবস্থান দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁদের নিয়োগের যৌক্তিকতা শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হবে দায়িত্ব পালনের ফলাফল, সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের মাধ্যমে।