অল্প কথায় জীবনের গল্প

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৮ ।। ফেইসবুকের ফাঁদে পৃথিবী কাঁদে

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৮ ।। ফেইসবুকের ফাঁদে পৃথিবী কাঁদে

।। ফেইসবুকের ফাঁদে পৃথিবী কাঁদে।। 

উৎসর্গ—

অনলাইন প্রতারণা ও সহিংসতার শিকার সব শিশু-কিশোরের স্মরণে—
যাদের হারানো শৈশব ও অসমাপ্ত স্বপ্ন আমাদের আরও মানবিক, সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

রাত এগারোটা। ষোলো বছরের রতন কুমার মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে বসে আছে। বই খোলা, কিন্তু পড়ায় মন নেই। ফেসবুকে একের পর এক ছবি, ভিডিও আর বার্তা ভেসে আসছে। মা দুবার দরজায় টোকা দিয়েছেন। রতনের একই উত্তর, “আর পাঁচ মিনিট!”

এই পাঁচ মিনিট যে কখন এক ঘণ্টা হয়ে যায়, রতন নিজেও জানে না।

হঠাৎ একটি খবর তার চোখে পড়ে। কুমিল্লার পনেরো বছরের স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের হত্যাকাণ্ড। খবরটি পড়ে রতনের মন খারাপ হয়ে যায়।

পরদিন স্কুলে বন্ধু নাবিলকে খবরটি দেখায় সে।

নাবিল বলে, “ফেসবুকে পরিচয় হলেই কি কাউকে বিশ্বাস করা যায়?”

রতন বলে, “যাকে প্রতিদিন কথা বলতে বলতে আপন মনে হয়, তাকে অবিশ্বাস করাও তো কঠিন।”

“কিন্তু অনলাইনে মানুষ নিজের পরিচয় লুকাতে পারে। সেটা ভুলে গেলে চলবে?”

রতন চুপ করে থাকে।

কথাটা তার নিজের জন্যও প্রযোজ্য।

সেদিন স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে আসেন মনোবিজ্ঞানী ডা. মাহমুদ হাসান।

রতন প্রশ্ন করে, “স্যার, কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে অপরিচিত মানুষের প্রতি এত সহজে আকৃষ্ট হয় কেন?”

ডাক্তার সাহেব বলেন, “কৈশোরে সবাই চায় কেউ তাকে বুঝুক, গুরুত্ব দিক। পরিবারে বকুনি বা অবহেলা অনুভব করলে অনলাইনে কারও সামান্য মনোযোগও অনেক বড় মনে হতে পারে। অসৎ মানুষ এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়।”

তিনি একটু থেমে বলেন, “কুমিল্লার তাজমিনের মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সতর্ক করে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর বাড়ি ছেড়ে সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে যায়। ফেরার পথে সে নৃশংস অপরাধের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়। এই ঘটনায় অপরাধীর দায়ই প্রধান। কোনো কিশোরীর আবেগ বা সিদ্ধান্ত তার ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় তার ঘাড়ে চাপানোর কারণ হতে পারে না।”

মিলনায়তন নীরব হয়ে যায়।

নাবিল জানতে চায়, “স্যার, তাহলে মা-বাবা কি আমাদের সব সময় নজরদারিতে রাখবেন?”

ডা. মাহমুদ হাসান মৃদু হেসে বলেন, “নজরদারি মানে সন্তানের প্রতিটি ব্যক্তিগত বার্তা গোপনে পড়ে ফেলা নয়। বয়স অনুযায়ী নিরাপত্তার নিয়ম তৈরি করতে হবে, অনলাইন বন্ধুদের বিষয়ে কথা বলতে হবে এবং বিপদের লক্ষণ চিনতে শেখাতে হবে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সন্তান ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “কেউ গোপনে দেখা করতে বললে, ব্যক্তিগত ছবি চাইলে কিংবা কাউকে না জানাতে চাপ দিলে সতর্ক হতে হবে। মা-বাবারও মনে রাখতে হবে, শুধু বকাঝকা করে সন্তানকে নিরাপদ রাখা যায় না। তার কথা শুনতে হয়, তার মনও বুঝতে হয়।”

রতনের মনে কথাগুলো গেঁথে যায়।

বাড়ি ফিরে রতন মায়ের পাশে বসে।

“মা, তুমি আমাকে মোবাইল কম ব্যবহার করতে বলো, আমি রাগ করি। কিন্তু কখনো কখনো তোমার সঙ্গে কথা বলতেও ভয় লাগে।”

মা ছেলের দিকে তাকান।

“কেন?”

“মনে হয়, কিছু বললেই বকবে।”

মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, “তুই ভুল করলেও আগে আমাকে বলবি। বকা পরে দেওয়া যাবে, আগে তোকে নিরাপদ রাখতে হবে।”

রতন মৃদু হাসে।

রাতে ফেসবুকে এক অপরিচিত ব্যক্তি বার্তা পাঠায়—‘তোমাকে একটা বিশেষ সুযোগ দিতে চাই। কাউকে বলবে না।’

রতন বার্তাটি পড়ে। তারপর অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে মাকে বিষয়টি জানায়।

মা শুধু বলেন, “সাবধানে থাকিস, বাবা।”

রতন মোবাইলটি টেবিলে রেখে দেয়। তার মনে হয়, পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান হয়তো তার জানা নেই। কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝেছে—অনলাইনে কাউকে আপন মনে হলেই তাকে বিশ্বাস করা যায় না। আবার সন্তানকে শুধু নিষেধ করেও নিরাপদ রাখা যায় না।

প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৃথিবীকে নিয়ে আসে। কিন্তু সেই পৃথিবীতে নিরাপদে চলতে হলে চাই সচেতনতা, আত্মসংযম আর পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক।

ফেসবুকের বন্ধুত্ব যেন জীবনের বন্ধ দরজা না হয়ে ওঠে। কারণ একটি ভুল বিশ্বাসের মাশুল কখনো কখনো কাঁদায় একটি পরিবারকে, আর সেই কান্না ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে।

লন্ডন, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬