তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ইউনূস সরকারের আমলে টিকার সংকটের আগাম সতর্কতা উপেক্ষা, ইউনিসেফের সতর্কবার্তা; হামে মৃত্যু ১১৮৬

ইউনূস সরকারের আমলে টিকার সংকটের আগাম সতর্কতা উপেক্ষা, ইউনিসেফের সতর্কবার্তা; হামে মৃত্যু ১১৮৬

ভয়েস অব পিপল বিশেষ প্রতিবেদন, ১৭ অক্টোবর:

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু থামছে না। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ৮টা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে হামের উপসর্গ ও পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে ১ হাজার ১৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪ জনের মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত; বাকি ১ হাজার ৮৫ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়ায় সন্দেহভাজন হিসেবে নথিভুক্ত। টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং লাখো শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারার বিষয়টি এই বিপর্যয়ের পেছনে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। টিকার সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা এবং রোগ নজরদারির সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

আগাম সতর্কবার্তা পেয়েও কেন টিকাসংকট?

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি দিয়ে টিকার সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হলে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হবে এবং শিশুদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।

চিঠিতে হাম-রুবেলা প্রতিরোধের এমআর টিকাসহ কয়েক ধরনের টিকার মজুত ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। টিকা সংগ্রহে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রক্রিয়াটি আট থেকে দশ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিল সংস্থাটি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পক্ষে মত দিয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগাম সতর্কতা থাকার পরও টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে ঘাটতি কেন তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক তৎপরতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

টিকাদানের হার কমেছে, বাদ পড়েছে লাখো শিশু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকাদানের হার ২০২৪ সালের ৯৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৯০ শতাংশে নেমে আসে। দ্বিতীয় ডোজের হার কমে ৯৩ থেকে ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় একই বয়সসীমার আরও প্রায় ৪০ লাখ শিশুর তথ্য পাওয়া যায়। এতে বহু শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার নতুন করে প্রায় ৩৪ লাখ বাদ পড়া শিশুকে টিকার আওতায় আনার কর্মসূচি শুরু করে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিশ্চিত হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার হার জরুরি কর্মসূচির আগে ছিল ৮২ শতাংশ; পরে তা ৮৫ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, জরুরি কর্মসূচির পরও আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ টিকার বাইরে ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যালোচনা

৪ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব টিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা সামনে এনেছে। সংস্থাটির সহায়তায় সরকার টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা, টিকা সংরক্ষণ, টিকাদানের তথ্য এবং রোগ নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনা শুরু করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নে টিকার মজুতসংকট ও নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক তৈরি করেছে। এর ফলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

সিলেটে ১৮০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য

রয়টার্সের অনুসন্ধানে সিলেটে হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমটির সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৬টি পরিবারের মধ্যে আটটি পরিবার জানায়, তারা টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিজেদের এলাকায় আসতে দেখেনি। অন্তত ছয়টি পরিবার বলেছে, তাদের এলাকায় শিশুমৃত্যুর পর স্বাস্থ্যকর্মীরা এসেছিলেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু জন্মনিবন্ধনের আওতার বাইরে থাকতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য থাকার তথ্যও তুলে ধরা হয়। এসব ঘাটতি শিশুদের শনাক্ত করা ও প্রত্যন্ত এলাকায় টিকা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে।

প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা কি আরও বেশি?

সরকারি হিসাবের বাইরে হামে আরও কতজন মারা গেছেন, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে সব মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি এবং প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ঘাটতি ছিল। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ যাচাই ও হাসপাতালের বাইরের মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ জরুরি।

সরকারি হিসাবে ১ হাজার ১৮৯ মৃত্যুর মধ্যে ১ হাজার ৮৫ জন সন্দেহভাজন হিসেবে তালিকাভুক্ত। তাঁদের সবাইকে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু বলা যাবে না; আবার এই সংখ্যাকে সরকারি হিসাবের বাইরের মৃত্যুও বলা যাবে না।

জবাবদিহি জরুরি

ইউনিসেফের আগাম সতর্কবার্তা, টিকা সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন এবং ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার তথ্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সিদ্ধান্তের জবাবদিহি দাবি করে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কেন সময়মতো টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তবে টিকাদানের ঘাটতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। তাই দায় নির্ধারণে আগের সরকারগুলোর সিদ্ধান্ত, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন—সবই পর্যালোচনা করা জরুরি।

টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর মৃত্যু ঠেকাতে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা, নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুর কারণ যাচাই করে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করতে হবে। আগাম সতর্কবার্তা কেন কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেয়নি, তার জবাব এখন জরুরি।