‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
লালনের সাধুসঙ্গের আড়ালে মাদকের আসর, জব্দ দুই হাজার কলকে
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৭ অক্টোবর:
ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে লালন উৎসব। লালন শাহের মৃত্যু দিবসে আয়োজিতব্য তিন দিনের অনুষ্ঠান সামনে রেখে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির মেলার মাঠে অভিযান চালিয়ে গাঁজা সেবনের প্রায় দুই হাজার কলকে জব্দ করে পুলিশ। উদ্ধার করা সরঞ্জামগুলোর আনুমানিক মূল্য দুই লাখ টাকার বেশি বলে জানা গেছে।

এই উৎসব ঘিরে সাধুসঙ্গ, মানবতাবাদ ও আত্মশুদ্ধির যে আদর্শের কথা বলা হয়, বাস্তবে সেই আয়োজনের সঙ্গে মাদক ব্যবহারের সমস্যাও জড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ছেঁউড়িয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান; লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও উৎসবের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ জানায়, ১১ অক্টোবর থেকে অভিযান শুরু হয়। জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যও অংশ নেন। প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল উৎসবকে মাদকমুক্ত রাখা।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর সংবাদ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, লালন স্মরণোৎসব ঘিরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে ছেঁউড়িয়া এলাকার এক বাবা ও ছেলেকে এক কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করার কথা জানায় পুলিশ।
এসব ঘটনা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট, লালন উৎসবকে ঘিরে মাদক ব্যবহার ও ব্যবসা প্রতিরোধে প্রশাসনকে অভিযান চালাতে হচ্ছে। ফলে উৎসবের পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও লালনভক্তদের অভিযোগ, প্রতিবছর উৎসবের সময় মেলার মাঠের বিভিন্ন স্থানে মাদক সেবন ও ক্রয়-বিক্রয় হয়। এতে ফকির লালনের দর্শন ও মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে উৎসবের পরিবেশের সাংঘর্ষিক চিত্র তৈরি হয়।
সাধুসঙ্গের দর্শন আর বাস্তব চর্চা এক নয়
অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবীগণ সাধুসঙ্গকে আত্মশুদ্ধি, মানবমুক্তি, সাম্য, প্রেম ও মুক্তচিন্তার মিলনমেলা হিসেবে তুলে ধরেন। সেখানে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, কাম-প্রেম, রস-রতি এবং নারী-পুরুষের যুগল সাধনা নিয়েও আলোচনার উল্লেখ থাকে। একজন নারীর একজন পুরুষ ‘সাধনসঙ্গী’ থাকতে হয়। এমনকি ফ্রান্স, ইতালী প্রভৃতি দেশ থেকেও অনেক নারী পুরুষ এ লালন আখড়ায় নিয়মিত আসেন এবং থাকেন।
কিন্তু লালন দর্শনে এসব বিষয় আলোচিত হওয়া আর সেই দর্শনের নাম ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক বা বেআইনি কাজে জড়ানো এক কথা নয়। নারী-পুরুষের একসঙ্গে উপস্থিতি কিংবা যুগল সাধনার আলোচনা থেকেই অবাধ যৌনাচার বা অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না।
তবে সাধুসঙ্গের নাম ব্যবহার করে কোথাও মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, যৌন হয়রানি কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা অনুসন্ধান ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম কিংবা উদারতার ভাষা কোনো অপরাধের ঢাল হতে পারে না।
লালনের আদর্শ রক্ষায় প্রয়োজন জবাবদিহি
লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শনের সঙ্গে মাদক ব্যবসা বা অপরাধকে এক করে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি তাঁর নাম ও ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে কাজে লাগিয়ে কোনো অনিয়ম চলতে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

এ জন্য উৎসবস্থলে মাদক বিক্রি ও সেবনের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি, সন্দেহভাজন অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং আয়োজকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত সাধক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের অযথা হয়রানি না করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করতে হবে।
লালনের সাধুসঙ্গ যদি সত্যিই আত্মশুদ্ধি, মানবপ্রেম ও মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দেয়, তাহলে সেই আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আয়োজনের মিল থাকা জরুরি। প্রশ্ন তাই লালনের দর্শন নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত আয়োজনকে মাদক ও অপরাধমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন।