বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন
বিশ্বে ক্ষুধার্ত ৬৪ কোটি ৫০ লাখ, বছরে অপচয় ১০৫ কোটি টন খাবার
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১৭ অক্টোবর:
বিশ্বে একদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ খাদ্য শেষ পর্যন্ত অপচয় হচ্ছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার হয়েছেন। আর জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি ইউএনইপির হিসাবে, ২০২২ সালে বিশ্বে পরিবার, রেস্তোরাঁ ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছে।
১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে এই বৈপরীত্য আবারও আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।
আফ্রিকায় ক্ষুধার চাপ সবচেয়ে বেশি

এফএওর ২০২৬ সালের ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ (SOFI) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে ক্ষুধার হার কমে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে করোনা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে প্রায় ৩০ কোটি ৯ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার হন। এশিয়ায় এ সংখ্যা ছিল ২৯ কোটি ২০ লাখ। আফ্রিকার জনসংখ্যার ২০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগেছে। অর্থাৎ বিশ্বে ক্ষুধা কমলেও অঞ্চলভেদে খাদ্যনিরাপত্তার বৈষম্য প্রকট।
বছরে নষ্ট হয় ১০৫ কোটি টন খাবার
ইউএনইপির ২০২৪ সালের ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে ভোক্তা পর্যায়ে সহজলভ্য খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ অপচয় হয়েছে। এর পরিমাণ ১০৫ কোটি টন। এর মধ্যে পরিবারের ফেলে দেওয়া খাবার ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন, রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা খাতে ২৯ কোটি টন এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ১৩ কোটি ১০ লাখ টন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মাথাপিছু বছরে গড়ে ১৩২ কেজি খাবার অপচয় হয়। এর মধ্যে গৃহস্থালি পর্যায়েই নষ্ট হয় ৭৯ কেজি। তবে এই পরিসংখ্যান ২০২২ সালের হিসাব; একে ২০২৬ সালের সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খাদ্য অপচয়ের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেও বিপুল খাবার নষ্ট হয়। এফএওর হিসাবে, উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর থেকে খুচরা বিক্রয়পর্যায়ের আগেই হারিয়ে যায়। অর্থাৎ খাদ্য অপচয়ের হিসাবের বাইরে সরবরাহব্যবস্থার এই ক্ষতিও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার বড় বাধা।
অপচয়ের শীর্ষে মালদ্বীপ—তবে রয়েছে অনিশ্চয়তা

ইউএনইপির দেশভিত্তিক প্রাক্কলনে মালদ্বীপে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। তবে এ ধরনের দেশের ক্রমতালিকা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সব দেশে জাতীয় পর্যায়ে সরাসরি ও সমান মানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি; অনেক ক্ষেত্রে অনুমান ও অন্যান্য দেশের উপাত্তের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। তাই মালদ্বীপকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খাদ্য অপচয়কারী দেশ বলা তথ্যের সীমাবদ্ধতা আড়াল করতে পারে।
অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বড় চাপ
ইউএনইপির হিসাবে, খাদ্য অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। উৎপাদিত অথচ খাওয়া হয় না—এমন খাদ্যের পেছনে জমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও পরিবহন ব্যয়ও নষ্ট হয়। ফেলে দেওয়া খাবার পচে মিথেনসহ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্ব খাদ্য দিবসের তাৎপর্য তাই শুধু ক্ষুধার পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন, সাশ্রয়ী দামে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা, উদ্বৃত্ত খাদ্য নিরাপদে বিতরণ এবং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপচয় কমানো জরুরি। ক্ষুধা মোকাবিলায় শুধু বেশি খাদ্য উৎপাদন যথেষ্ট নয়; উৎপাদিত খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ, ন্যায্য বণ্টন এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।