দ্রুত দেবে যাচ্ছে ঢাকাসহ ৪০ শহর, সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের

দ্রুত দেবে যাচ্ছে ঢাকাসহ ৪০ শহর, সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ১ মার্চ ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ থাকলেও, নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে—বিশ্বের অন্তত ৪০টি বড় শহর দ্রুত মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা-ও।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় বিশ্বের ৪০টি প্রধান নদী বদ্বীপ অঞ্চলের বিস্তারিত মানচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বহু শহরে ভূমি অবনমনের হার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ বদ্বীপ এলাকায় হলেও সেখানে বসবাস করছে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। বিশ্বের বড় ৩৪টি শহরের মধ্যে অন্তত ১০টি এ ধরনের নিচু বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এসব অঞ্চলে মাটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে।

গঙ্গা বদ্বীপের শহর ঢাকা ও কলকাতা, নীল নদের তীরে আলেকজান্দ্রিয়া, ইয়াংজি নদীর তীরে সাংহাই এবং মেকং বদ্বীপে হো চি মিন সিটি—সবকটিই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শহর অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; এখানে বড় বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে সামান্য ভূমি অবনমনও ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, ৪০টির মধ্যে অন্তত ১৮টি বদ্বীপ অঞ্চলে ভূমি দেবে যাওয়ার হার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। দ্রুত নগর সম্প্রসারণ ও প্রাকৃতিক পলি প্রবাহ ব্যাহত হওয়াও এই পরিস্থিতিকে ত্বরান্বিত করছে।

এ অবস্থায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও নতুন করে ভাবাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত। দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে দাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার উপকূলীয় সাবডাকশন জোন দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় বলে চিহ্নিত। অতীতে ১৮৯৭ সালের প্রায় ৮.১ মাত্রার মহাভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের বড় ভূমিকম্প এ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ভবিষ্যতে যদি ৮ থেকে ৯ মাত্রার একটি মেগা ভূমিকম্প ঢাকার নিকটবর্তী ফল্ট লাইনে আঘাত হানে, তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। কারণ, ঢাকার বড় অংশ নরম পলিমাটির ওপর নির্মিত—যা ভূমিকম্পের কম্পনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ভূমি দেবে যাওয়ার বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে শক্তিশালী কম্পন যুক্ত হলে মাটির স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে বহুতল ভবন ধস, সড়ক ও সেতুর ফাটল, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিপর্যয় এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো একাধিক বিপদ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। অনেক এলাকায় ভূমিধস ও মাটির তরলীকরণ (লিকুইফ্যাকশন) ঘটলে সম্পূর্ণ পাড়া বা ব্লক ধসে পড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দুর্যোগ বিশ্লেষকদের ভাষায়, ভূমি অবনমন, জলাবদ্ধতা ও ৮–৯ মাত্রার ভূমিকম্প—এই তিন ঝুঁকি যদি একই সময়রেখায় এসে মিলে যায়, তাহলে রাজধানীর বড় অংশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। চরম পরিস্থিতিতে ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়া বা গভীরভাবে ধসে যাওয়া বিচিত্র নয়—এমন সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন কেউ কেউ।

তবে বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে জোর দিচ্ছেন—এটি অনিবার্য পরিণতি নয়, বরং ঝুঁকি। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বিপর্যয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কঠোরভাবে ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ, খাল-নদী পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারকদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদ ও নগর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু কাগুজে পরিকল্পনা নয়—বাস্তবায়ন, নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জনগণকে ভূমিকম্প প্রস্তুতি, নিরাপদ ভবন নির্বাচন এবং জরুরি সাড়া প্রদানের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করাও প্রয়োজন।

ঢাকা নীরবে দেবে যাচ্ছে—এই তথ্য আতঙ্কের নয়, বরং সতর্কতার। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সময় থাকতে সক্রিয় হওয়াই হতে পারে রাজধানীকে রক্ষার একমাত্র কার্যকর পথ।