ডিআইএ অডিটে উঠে এসেছে আর্থিক লেনদেন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের চিত্র

ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে বড় অনিয়মের অভিযোগ, ১৯৮ জনের মধ্যে ১০৫ নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ

ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে বড় অনিয়মের অভিযোগ, ১৯৮ জনের মধ্যে ১০৫ নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ আগস্ট:

রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটির অনুমোদিত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব নিয়োগে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ বা নিয়োগ কমিটি গঠনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিআইএ’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কলেজের শিক্ষক নিয়োগের একটি বড় অংশে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার দাবি থাকলেও নিয়োগ কমিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ

অডিট প্রতিবেদনে গত কয়েক বছরের আর্থিক লেনদেনেও একাধিক অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকিং নিয়ম না মেনে নগদে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করার তথ্য পাওয়া গেছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিধি অনুযায়ী, সব অর্থ নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রেখে চেক বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় করার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ভ্যাট ও উৎসে আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকা সরকারি রাজস্ব জমা না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে ভ্যাট কর্তন না করা এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত সম্মানীর ওপর আয়কর না কাটার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

গভর্নিং বডির সম্মানী নিয়েও প্রশ্ন

অডিটে ঢাকা সিটি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী গ্রহণ নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত গভর্নিং বডির সদস্যরা মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সম্মানী নিয়েছেন, যার কোনো বৈধ বিধান নেই বলে ডিআইএ উল্লেখ করেছে।

অডিট কর্তৃপক্ষ ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

অতিরিক্ত পদায়ন ও বেতন নিয়েও আপত্তি

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে কলেজটিতে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক রাখা হয়েছে। তাদের নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার বিষয়টিকেও বিধিবহির্ভূত হিসেবে উল্লেখ করেছে ডিআইএ।

জবাব দিতে ১৫ কার্যদিবস সময়

ডিআইএ’র পক্ষ থেকে ঢাকা সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষকে অডিটে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রমাণসহ ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো সরকারি আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের জবাব ও প্রমাণপত্র পর্যালোচনার পর নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিবেদনে কলেজটির প্রশাসনিক নথি, আর্থিক হিসাব ও কিছু আইনি বিষয়ের নথি উপস্থাপন না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ১০ হাজার ৮১১ শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত ঢাকা সিটি কলেজ দেশের অন্যতম পরিচিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অডিট প্রতিবেদনের এসব অভিযোগ এখন শিক্ষা প্রশাসনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে যুক্ত করা হবে।