ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী বার্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

তারেক রহমান–সার্জিও গর বৈঠক : মার্কিন আস্থার বার্তা, বিনিয়োগের আশ্বাস—তবু বাংলাদেশিদের জন্য কড়াকড়ি ভিসা বন্ড

তারেক রহমান–সার্জিও গর বৈঠক : মার্কিন আস্থার বার্তা, বিনিয়োগের আশ্বাস—তবু বাংলাদেশিদের জন্য কড়াকড়ি ভিসা বন্ড

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ আগস্ট:

ঢাকা: বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা, বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি সার্জিও গর বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষি অবকাঠামো উন্নয়ন, আইটি খাতে অংশীদারিত্ব এবং রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দেন।

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ওপর তাদের আস্থা রয়েছে। এমনকি মার্কিন ভ্রমণ সতর্কতা (ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি) ইতিবাচকভাবে পুনর্বিবেচনার কথাও জানানো হয়, যাতে মার্কিন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও উৎসাহ পান।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, আধুনিক ওয়্যারহাউজ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং খাদ্য ও ওষুধ পরীক্ষাগার স্থাপনে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। উভয় পক্ষ এফডিএর সহযোগিতায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার চালুর উদ্যোগ পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়েও একমত হয়।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়। কক্সবাজার সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সার্জিও গর বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং সংকটের টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রীও রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আর্থিক ও মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেন।

তবে এই ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই ওয়াশিংটনের আরেকটি সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশসহ ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ড কর্মসূচি স্থায়ী করার ঘোষণা দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসায়িক (বি-১) ও পর্যটন (বি-২) ভিসা আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারের আগে ১০ হাজার অথবা ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বন্ড জমা দিতে হতে পারে। ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা ভিসার শর্ত যথাযথভাবে পালন করলে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। তবে নিয়মটি কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বৈপরীত্য। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে; অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে, যাদের নাগরিকদের কাছ থেকে উচ্চ অঙ্কের ভিসা বন্ড নেওয়া হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগের আহ্বান ও রাজনৈতিক আস্থার বার্তার পাশাপাশি ভিসা নীতিতে এই কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে মিশ্র সংকেত তৈরি করতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা প্রকাশ করা হলেও নাগরিকদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক শর্ত আরোপ সেই বার্তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না।

অনেকের প্রশ্ন, যদি বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এসে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে একই সময়ে বাংলাদেশি সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার ডলারের বন্ড বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? কূটনৈতিক সৌজন্যের ভাষা আর বাস্তব নীতির এই ফারাকই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।