‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
বাংলাদেশের নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারের দাবি বিজেপি নেতার
ভারত প্রতিনিধি, ৭ নভেম্বর :
বাংলাদেশের নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতের অংশ হিসেবে পুনরুদ্ধারের দাবি তুলেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। তাঁর অভিযোগ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের স্বার্থ উপেক্ষা করে এসব অঞ্চল পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা আসনের এই বিজেপি সংসদ সদস্য বলেন, শুধু পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর নয়, নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দরও পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে। তাঁর দাবি, এসব অঞ্চল একসময় ত্রিপুরার প্রাচীন টিপরা রাজ্যের অংশ ছিল। দেশভাগের সময় ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য এসব অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আপত্তি উপেক্ষা করা হয়।
দুবে ১৯৪৬ সালের নোয়াখালী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে নেহরুর রাজনৈতিক ভূমিকারও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় নোয়াখালীর পরিস্থিতির চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লীগকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েই নেহরুর বেশি আগ্রহ ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিজেপি নেতার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের উত্তরসূরি এবং তিপ্রা মথা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, দেশভাগের সময় তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছিল ভারতের ইতিহাসের বড় কৌশলগত ভুল। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতের প্রবেশাধিকার থাকলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেক শক্তিশালী হতো। এমনকি শিলিগুড়ি করিডর বা 'চিকেনস নেক' নিয়ে ভারতের উদ্বেগও কমে যেত।
তবে নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের প্রথম তফসিলে চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও তৎকালীন টিপেরা জেলা পূর্ববঙ্গের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সিলেট ছিল আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত গণভোটে সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেন। বৈধ ভোটের ৫৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে পড়ে।
এ ছাড়া ত্রিপুরা ছিল পৃথক দেশীয় রাজ্য। মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারানি কাঞ্চনপ্রভা দেবী নাবালক উত্তরাধিকারীর পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর চুক্তির মাধ্যমে ত্রিপুরার প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের হাতে ন্যস্ত হয়। ফলে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের সরাসরি ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক নথির সঙ্গে মেলে না।
বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দেশভাগের প্রায় আট দশক পর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বীকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের এমন বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে কী বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের এমন মন্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।