বাংলাদেশের অর্থনীতি চাপে: মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় ও বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি চাপে: মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় ও বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি

ঢাকা প্রতিনিধি: উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টানা মূল্যস্ফীতির চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বেসরকারি খাত ক্রমশ সংকটের দিকে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোর পর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে বিনিয়োগ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্পে না গিয়ে বিদ্যমান ঋণের চাপ সামলাতেই ব্যস্ত।

একই সঙ্গে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে অন্তত ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং চালু থাকা কারখানাগুলোও গড়ে ৫০–৭০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।

এদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে—

চাল

  • মাঝারি মান: ৬০ – ৬৮ টাকা/কেজি

তেল ও ডাল

  • সয়াবিন তেল (বোতল): প্রায় ২০০ টাকা/লিটার
  • খোলা সয়াবিন তেল: ১৮৬ – ১৯৫ টাকা/লিটার

সবজি

  • কাঁচা পেঁপে: ১৫০ – ১৬৭% পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি
  • বেগুন: ৬০ – ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি
  • কাঁচা কলা: প্রায় ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি

ডিম

  • ডজন: ২১–২২% পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি

এলপিজি গ্যাস (১২ কেজি)

  • সরকার নির্ধারিত দাম: ১,৯৪০ টাকা
  • বাজারে বিক্রি: প্রায় ২,১০০–২,২৪০ টাকা

জ্বালানি তেল (সরকারি নির্ধারিত)

  • ডিজেল: ১১৫ টাকা/লিটার
  • পেট্রল: ১৩৫ টাকা/লিটার
  • অকটেন: ১৪০ টাকা/লিটার
  • কেরোসিন: ১৩০ টাকা/লিটার

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয়েছে। শুধু উৎপাদন নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসার খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফার পরিবর্তে লোকসানের মুখে পড়ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে বাজার বিশ্লেষণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকোচন, অন্যদিকে বাজারে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি—এই দুই চাপ মিলিয়ে অর্থনীতি এক ধরনের “দ্বিমুখী সংকটে” পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।