“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৪।। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের খেলাধুলা হোক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চারও মিলনমেলা
উৎসর্গ
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সকল সদস্যের প্রতি

খেলাধুলা শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। সহকর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়াতেও এর ভূমিকা রয়েছে। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করে। তবে সময় এসেছে, এই আয়োজনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক করার। আমরা কেউই আর বিশ-পঁচিশ বছরের তরুণ নই। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার ভিন্নতা বিবেচনায় রেখে এমন কিছু প্রতিযোগিতা ও কর্মকাণ্ড যুক্ত করা প্রয়োজন, যেখানে সদস্যরা আঘাতের ঝুঁকি তুলনামূলক কমিয়ে আনন্দের সঙ্গে অংশ নিতে পারবেন।
বেশ কিছুদিন আগে আমাদের খবর পাঠক, ক্লাব সদস্য, আবৃত্তিকার সালাউদ্দিন শাহীন ভাই খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সম্প্রতি আরেকজনের খেলতে গিয়ে আহত হওয়ার কথাও শুনেছি। এভাবে মাঝে মাঝেই আহত হবার খবর শুনি। নিজের অভিজ্ঞতাও কম নয়। ছেলের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে হাঁটুর ব্যথায় প্রায় চার বছর ভুগেছি। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই মনে হয়, বার্ষিক ক্রীড়া আয়োজনে ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টনের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন হলো, প্রেসক্লাবের কর্মকাণ্ড কি শুধু খেলাধুলা আর পেশাগত প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের পেশা নয়; এটি জ্ঞান, চিন্তা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতারও ক্ষেত্র। সেই বিবেচনায় লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
কী কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?
১. বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা: নিয়মিতভাবে এবং বছরে অন্তত একবার দাবা, ক্যারম, সাধারণ জ্ঞান, কুইজ ও শব্দধাঁধার প্রতিযোগিতার আয়োজনের পাশাপাশি বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা নিয়ে কুইজ সদস্যদের জ্ঞানচর্চাকে আনন্দময় করে তুলবে।
২. বিতর্ক ও তাৎক্ষণিক বক্তৃতা: সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এবং তাৎক্ষণিক বক্তৃতার আয়োজন করা যেতে পারে। এতে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতা বাড়বে।
৩. সাহিত্যচর্চা ও আবৃত্তি: কবিতা আবৃত্তি, তাৎক্ষণিক কবিতা রচনা, গল্প বলা, প্রবন্ধ/কলাম লেখা এবং নাট্যচর্চার আয়োজন করা যেতে পারে। নিয়মিত সাহিত্য আলোচনা ও লেখালেখির কর্মশালা সদস্যদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হবে।
৪. প্রেসক্লাব ম্যাগাজিন প্রকাশ: সদস্যদের প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, স্মৃতিকথা, গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়ে বছরে অন্তত একবার একটি মানসম্মত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের বাইরের সৃজনশীল পরিচয়ও পাঠকের সামনে আসবে।
৫. সদস্যদের বই প্রকাশে সহযোগিতা: প্রেসক্লাবের যেসব সদস্য বই লেখেন, তাঁদের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান, আলোচনা ও প্রচারে সহযোগিতা করা যেতে পারে। এতে নতুন লেখক তৈরি এবং প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটবে।
৬. বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান: গান, কবিতা, হাস্যরস, স্মৃতিচারণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে অন্তত মাসে একদিন অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। এতে কর্মব্যস্ত সাংবাদিকদের মধ্যে আনন্দ ও পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
৭. সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়: প্রেসক্লাবে মাঝেমধ্যে সাংবাদিকতার ওপর প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল গণমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
৮. বার্ষিক সাংবাদিক পুরস্কার: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সেরা সংবাদ, বিশ্লেষণধর্মী লেখা, প্রবাসী সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে বার্ষিক পুরস্কার চালু করা যেতে পারে। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নীতিমালার ভিত্তিতে এই পুরস্কার দেওয়া হলে তা সদস্যদের উৎসাহিত করবে।
৯. বইপাঠ ও জ্ঞানচর্চার আসর: দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ বই, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হতে পারে। সদস্যদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
১০. সাইকেল চালানো: গ্রুপ তৈরি করে অন্তত সপ্তাহে একবার বিভিন্ন পার্কে সদস্যরা মিলে সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন। এতে শরীর ও মনের ব্যায়াম হবে।
১১. দলবেধে হাঁটা প্রতিযোগিতা: দলবেঁধে গ্রুপ করে করে হেঁটে হেঁটে লন্ডনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, পার্ক ইত্যাদি পরিদর্শনে বের হওয়া যেতে পারে সপ্তাহে বা অন্তত মাসে একদিন। যে দল আগে গন্তব্যে পৌছবেন তাঁদের ছোটখাটো পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে শারীরিক ব্যায়াম হবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থ বা বিশাল আয়োজন অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন সদিচ্ছা, পরিকল্পনা এবং সদস্যদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। একটি বার্ষিক কর্মসূচি তৈরি করে কোন মাসে কী আয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সদস্যদের আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে দিলে অনেক উদ্যোগই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সদস্যরা শুধু সাংবাদিক নন; তাঁদের মধ্যে লেখক, কবি, আবৃত্তিশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ মানুষ রয়েছেন। তাঁদের প্রতিভা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে প্রেসক্লাব আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার কারণে যাঁরা শারীরিক প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তাঁরাও বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় থাকতে পারবেন।
আমার প্রস্তাব, আগামী মাস থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা হোক। সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ চলুক, তার সঙ্গে চলুক সাহিত্যচর্চা, বই প্রকাশ, বিতর্ক, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার বিকাশ।
প্রেসক্লাবের শক্তি শুধু তার সদস্যসংখ্যায় নয়, সদস্যদের জ্ঞান, চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সম্মিলিত অর্জনে। খেলাধুলা আমাদের আনন্দ দিক, আর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদের সমৃদ্ধ করুক—এই হোক লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের আগামী দিনের অঙ্গীকার।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১১ অক্টোবর, ২০২৬