ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নাট্য সারথী গোলাম কবির: মঞ্চ থেকে পর্দা, সংস্কৃতির টানে আজও অবিচল

নাট্য সারথী গোলাম কবির: মঞ্চ থেকে পর্দা, সংস্কৃতির টানে আজও অবিচল

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

ইস্ট লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্য সারথী গোলাম কবির এক পরিচিত মুখ। মঞ্চনাটক, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, কবিতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন থেকে লন্ডনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল—সবখানেই তিনি রেখে চলেছেন তাঁর সম্পৃক্ততার স্বাক্ষর। বর্তমানে লন্ডনের সেন্ট বার্থ হাসপাতালে হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা এই সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবাসী বাঙালির নাট্যচর্চার অনেক স্মৃতি, সৃজনশীল উদ্যোগ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প।

কবির ভাই বর্তমানে লন্ডনের সেন্ট বার্থ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১২ অক্টোবর, সোমবার, তাঁর ওপেন-হার্ট সার্জারি হওয়ার কথা। এর আগে গত ২ অক্টোবর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা জানিয়ে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে লিখেছেন, তাঁর বাইপাস সার্জারি অবধারিত। এমন একটি কঠিন সময়েও তিনি সাংস্কৃতিক সহযাত্রীদের খোঁজখবর রাখছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও পড়েছেন আমার সর্বশেষ (১০ অক্টোবর প্রকাশিত) ‘কলিকালের কলধ্বনি’ কলামের ১৬৩তম পর্ব। লেখাটি পড়েছেন বলে নিজেই জানিয়েছেন মেসেজে। শারীরিক সংকটের মধ্যেও অনুজপ্রতিমদের প্রতি তাঁর এই মনোযোগ নিছক সৌজন্য নয়; বরং সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার আন্তরিকতারই পরিচয় বহন করে।

গত বুধবার প্রথমে তাঁর খবরটি শুনে মন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কারণ, কবির ভাই কেবল একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নন; প্রায় দুই দশক ধরে তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ও অনেকের নাট্যচর্চার স্মৃতি, শেখার অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল কাজের এক বিশেষ অধ্যায়।

প্রায় দুই দশক আগে, পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে আমি সাংবাদিকতার পাশাপাশি শখের বশে মাঝেমধ্যে টুকটাক মঞ্চনাটকে অভিনয় করতাম। সেই সময় কবির ভাই ছিলেন আমাদের নাট্যগুরু। অভিনয়ের নানা দিক নিয়ে তিনি প্রশিক্ষণ দিতেন, নাটককে কীভাবে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলতে হয়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতেন। আমরা অনেকেই নাটককে ভালোবেসে এগিয়ে আসা উৎসাহী তরুণ তখন; আর কবির ভাইয়ের ছিল অভিনয় ও নাট্য পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাঁর কাছ থেকে শেখার সুযোগ আমাদের নাট্যচর্চাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল।

অবশ্য নাটকের সঙ্গে আমার নিজের যোগাযোগের শুরু আরও কিছুটা আগেই। লন্ডনে বাংলা টেলিভিশনের তিন-চারটি বিজ্ঞাপনে ‘মডেল হিসেবে’ কাজ করে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছিলাম। ঈদ উপলক্ষে নিজের লেখা ছোট ছোট নাটিকায় অভিনয়ও করেছি। ফলে অভিনয় ও নাট্যচর্চার প্রতি আগ্রহ আমার আগে থেকেই ছিল। দেশে থাকতে অবশ্য কোনদিন অভিনয় করা হয়নি। শুধু সিনেমা ও নাটক দেখা হয়েছে প্রচুর। বেশি সখ ছিল পরিচালনার ব্যাপারে। লন্ডনে নাটককে ঘিরে যে দলগত কাজ, প্রস্তুতি এবং মঞ্চের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেখানে কবির ভাইয়ের মতো অভিজ্ঞ মানুষের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

উদীচীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর আমাদের সেই নাট্যসম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। কবির ভাই এবং আমার বন্ধু প্রসেনজিতের আগ্রহে উদীচীতে যোগ দিয়েছিলাম। অবশ্য কিছুদিন পর আমি নিজেই উদীচী থেকে বেরিয়ে আসি। ঐ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে আমরা নির্মাণ করি টেলিভিশন নাটক ‘রোববার’। সময়টা ছিল  ২০০৭ সাল। নাটকটির পরিচালক ছিলেন গোলাম কবির। আমি কাজ করেছিলাম প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। নাটকের আয়োজন থেকে শুরু করে, বিজ্ঞাপন যোগাড় করা এবং চিত্রনাট্য রচনা—এসব কাজের দায়িত্বও ছিল আমার ওপর।

‘রোববার’ নাটকটি আমাদের কাছে ছিল বিশেষ একটি অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথের গল্পকে টেলিভিশনের উপযোগী করে উপস্থাপন করা, দৃশ্য বিন্যাস, অভিনয় এবং পরিচালনার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো—সব মিলিয়ে এটি ছিল সম্মিলিত সৃজনশীল প্রয়াস। সুটিং করেছিলাম মাইল এন্ড পার্ক, স্টেপনি গ্রিনের একটি গাড়ির গ্যারেজ, বো বিজনেস সেন্টার, ও রেড ব্রিজের লোকেশনে। নাটকে রোমান্টিক গানও ছিল। আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলাম। কবির ভাইয়ের পরিচালনায় নাটকটি অসাধারণ হয়ে উঠেছিল বলে আমার মনে আছে। তাঁর নির্দেশনা, নাটক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা এবং কাজের প্রতি মনোযোগ সেই প্রযোজনাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।

আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ‘রোববার’ শুধু একটি টেলিভিশন নাটক নয়; আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়ও। এরপর আমি উদীচীর হয়ে ‘কালের সাক্ষী’ মঞ্চ নাটকের নির্দশনাও দিয়েছিলাম। সে সময়ও তাঁর অনুপ্রেরণা পেয়েছি। গত বিশ বছরে বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটক লিখে ফেলে রেখেছি। ওসবে আর সময় বের করা সম্ভব হয় না দীর্ঘদিন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভাল করে তাঁর সাথে পরিচয় হবার আগেই আমি ও  আসিফ ইসলাম (তখন আমি ও আসিফ ‘মিডিয়া মিরাকল’ নামক বিজ্ঞাপনী সংস্থার পার্টনার) মিলে তাঁকে মডেল করে টিভির জন্য একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করি। বিজ্ঞাপনটি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। শুনেছি আসিফ আজকাল নাকি স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র বানিয়ে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে ইতোমধ্যে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় শিকড় থাকা কবির ভাই কর্মজীবনের কারণে একসময় ঢাকায় বসবাস করেছেন। তাঁর শিকড় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করার পাশাপাশি তিনি নাট্যচর্চায় সক্রিয় ছিলেন। মঞ্চনাটকের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন দেশে থা্কতে। চাকরি ও শিল্পচর্চাকে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়ার এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

ঢাকায় তাঁর বাসাকে ঘিরে নাট্যাঙ্গনের মানুষের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। সহকর্মী ও নাট্যকর্মীরা সেখানে আসতেন, আড্ডা দিতেন, নাটক নিয়ে আলোচনা করতেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অতিথিদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতেন। নাটক করার সময় তাঁর ইস্ট লন্ডনের বাসায় আমরা দল বেঁধে গিয়ে কখনো খালিমুখে ফিরে আসতে পারিনি। তিনি ও ভাবী খুবই অতিথিপরায়ন। তাঁর মুখে থাকত হাসি, অতিথিদের প্রতি থাকত অকৃত্রিম আন্তরিকতা। নাটকের মানুষদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সহজ ও প্রাণবন্ত। তাঁদের জন্য নিজের বাসার দরজা খোলা রাখার মধ্যে প্রকাশ পেত নাটকের প্রতি তাঁর গভীর টান।

একজন নাট্যকর্মীর পরিচয় শুধু তাঁর অভিনয় কিংবা পরিচালিত নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, নতুনদের শেখানোর আগ্রহ এবং নাটককে ঘিরে একটি সৃজনশীল পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্যেও তাঁর ভূমিকা প্রকাশ পায়। কবির ভাইয়ের জীবনেও এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজে অভিনয় করেছেন, অন্যদের অভিনয় শেখাতে সহায়তা করেছেন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশে থাকাকালে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততাও ছিল উল্লেখযোগ্য। উদীচী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গান, নাটক, আবৃত্তি ও অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করে আসছে। কবির ভাইয়ের সাংস্কৃতিক যাত্রায় এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আজকের প্রায় সকলেই তাঁর পরিচিত ও বন্ধুস্থানীয়। 

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পরও কবির ভাইয়ের সংস্কৃতিচর্চা থেমে থাকেনি। ইস্ট লন্ডনের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি পরিচিত মুখ। উদীচী যুক্তরাজ্য শাখার সহসভাপতি হিসেবে তিনি সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির শিল্প-সাহিত্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার কাজে তাঁর সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য।

লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো উদীচী। সংগীত, নাটক, কবিতা, আবৃত্তি ও অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চাকে সচল রাখার চেষ্টা করে। বহুজাতিক সমাজে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক ধরে রাখতেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

কবির ভাইয়ের সাংগঠনিক ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সম্মেলনের সংবাদে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে লন্ডনে উদীচীর আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন।  অভিনয় ও নাট্য পরিচালনার পাশাপাশি কবিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়কে তুলে ধরে। ইতোমধ্যে তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ ও ভ্রমণকাহিনী গ্রন্থ আকারে বের হয়ে সমাদৃত হয়েছে।

২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত উদীচী যুক্তরাজ্য শাখার দ্বাদশ সম্মেলনেও তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন। এই অংশগ্রহণ দেখায়, প্রবাসে সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নয়, সংগঠক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।

ব্রাডি আর্টস সেন্টার গোলাম কবিরের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। এই স্থানেই একসময় আমরা নাটকের মহড়া ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেখানে নাট্যগুরু হিসেবে তাঁর কাছ থেকে শেখার অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি উদীচীর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতিও রয়েছে। একই সাংস্কৃতিক পরিসর তাই ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রবাসী বাঙালির সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে একসূত্রে বেঁধেছে।

কবির ভাইয়ের কথা বলতে গেলে তাঁর সাংগঠনিক পরিচয় কিংবা শিল্পচর্চার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে আসে। ঢাকায় নাট্যকর্মীদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিকতা, লন্ডনে সাংস্কৃতিক সহযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দীর্ঘদিনের পরিচিতজনদের কাজের প্রতি আগ্রহ—এসব তাঁর ব্যক্তিত্বের মানবিক দিকটি তুলে ধরে।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও আমার লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানানো সেই আন্তরিকতার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। নিজের জীবন যেখানে কঠিন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, সেখানেও তিনি সহযাত্রীর লেখার খোঁজ রাখছেন। এই ছোট্ট ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে স্পর্শ করেছে। কারণ, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের মূল্য বোঝা যায় অনেক সময় এমন মুহূর্তেই—যখন নিজের জীবনের সংকটের মধ্যেও অন্যের কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার মানসিকতা অটুট থাকে।

কবির ভাইয়ের জীবন ও কর্মকাণ্ডের সব দিক নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে তাঁর অভিনীত নাটক, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রের নাম, নাট্যদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সময়কাল এবং লন্ডনে উদীচীর বাইরেও তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা গেলে তাঁর শিল্পীজীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি হবে। সহকর্মীদের স্মৃতিচারণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে যেসব অভিজ্ঞতা সরাসরি তাঁর সঙ্গে কাজ করার সূত্রে জানা, সেগুলোই তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের একটি জীবন্ত পরিচয় দেয়। প্রায় দুই দশক আগে ব্রাডি আর্টস সেন্টারে নাট্যগুরু হিসেবে তাঁকে পাওয়া, উদীচীর উদ্যোগে ‘রোববার’ নির্মাণে তাঁর পরিচালনায় কাজ করা এবং আজও তাঁর সাংস্কৃতিক সহযাত্রীরূপে যোগাযোগ থাকা—এসব স্মৃতি আমার কাছে মূল্যবান।

কবির ভাইয়ের জীবনের পথচলা কুলাউড়া থেকে ঢাকায়, আর সেখান থেকে লন্ডনে বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের মধ্যেও নাটক ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রয়েছে। অভিনয়, পরিচালনা, কবিতা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর জীবন তাই কেবল ব্যক্তিগত কর্মজীবনের বিবরণ নয়; এটি সংস্কৃতিকে ভালোবেসে দীর্ঘদিন কাজ করে যাওয়া একজন মানুষের পথচলারও দলিল।

আজ তাঁর সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ সুস্থ হয়ে ওঠা। ১২ অক্টোবরের অস্ত্রোপচারকে সামনে রেখে তাঁর সহকর্মী, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা নিশ্চয়ই তাঁর সুস্থতার প্রত্যাশায় রয়েছেন। যিনি একসময় আমাদের নাটক শেখাতেন, সৃজনশীল কাজে নেতৃত্ব দিতেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক ধরে রেখেছেন, তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।

কবির ভাই আমাদের কাছে শুধু একজন নাট্য সারথী নন; তিনি নাটককে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, সম্মিলিত সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক ভালোবাসার এক পরিচিত নাম। মঞ্চের আলো থেকে হাসপাতালের শয্যা—জীবনের এই কঠিন সময়েও তাঁর সাংস্কৃতিক সহযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট থাকুক। তিনি সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসুন প্রিয় মানুষদের কাছে, প্রিয় সংস্কৃতির অঙ্গনে।

লন্ডন, ১১ অক্টোবর, ২০২৬