‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৭ ।। রোজ তাই চাঁদা ভাই টিপ দেয় কপালে

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৭ ।। রোজ তাই চাঁদা ভাই টিপ দেয় কপালে

উৎসর্গ

সেই সব সাধারণ মানুষের প্রতি,
যাঁরা চাঁদা দেন ভয়ে,
মুখ বুজে থাকেন বাঁচার তাগিদে,
আর প্রতিদিন নিজের কপালের ঘাম মুছে
অন্যের কপালে ক্ষমতার টিপ পরতে দেখেন।

বাজারের মোড়ে রহিমের চায়ের দোকান। সকালবেলা দোকানে ভিড় কম। কুদ্দুস বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছে। তার কোনো চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। তবু মাসের শেষে তার পকেটে টাকা থাকে। একটা সিএনজি তার সাথে থাকে সব সময়। এটাতেই সে আজকাল চলাফেরা করে।

রহিম একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করে, “কুদ্দুস ভাই, আপনি করেনটা কী?”

কুদ্দুস চায়ে চুমুক দেয়। “কিছু করি না।”

“তাহলে চলেন কীভাবে?”

“ভাইয়ের সঙ্গে আছি।”

রহিম আর প্রশ্ন করে না। এ এলাকার মানুষ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানে বলেই প্রশ্ন করে না।

কুদ্দুসের ভাই বেশ নামকরা মানুষ। বাজারে তাঁর প্রভাব আছে, থানায় পরিচয় আছে, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা আছে। তিনি হাসিমুখে কথা বলেন। কেউ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ান। অবশ্য পাশে দাঁড়ানোর আগে তিনি লোকটির সামর্থ্য বুঝে নেন।

ফুটপাতে সবজি বিক্রি করেন নাসিমা। স্বামী মারা গেছে তিন বছর। ছেলেটা স্কুলে পড়ে। সংসার চলে সবজি বেচে। আজকাল তার মুখে হাসি কম দেখা যায়।

রহিম একদিন বলে, “খালা, মন খারাপ?”

নাসিমা বেগুন সাজাতে সাজাতে বলে, “মন খারাপ করে কী হবে? মন তো আর বাজারে বেচতে পারি না।”

রহিম হেসে ফেলে।

নাসিমা বলে, “হাসেন কেন? বেগুনের দাম বাড়লে মানুষ দরদাম করে। আর আমার কষ্টের দাম কেউ জিজ্ঞেস করে না।”

রহিম এবার আর হাসে না।

দুপুরে কুদ্দুস আসে। নাসিমার ঝুড়ি থেকে একটা বেগুন তুলে নেয়।

নাসিমা বলে, “বাবা, বেগুনটার দাম দিও।”

কুদ্দুস অবাক হয়। “খালা, আমাকে চিনলেন না?”

“চিনি বলেই তো বলছি। অন্য কাউকে হলে বলতাম না।”

কুদ্দুস কিছুক্ষণ বেগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়।

রহিম দোকানের ভেতর থেকে দৃশ্যটা দেখে। তার মনে হয়, মানুষকে ভয় দেখানো সহজ, কিন্তু মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা কঠিন।

বিকেলে এলাকার স্কুলের মাঠে সভা। কুদ্দুসের ভাই প্রধান অতিথি। মঞ্চে বসে তিনি বলেন, “আমি সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমার রাজনীতি।”

সামনের সারিতে বসা লোকজন হাততালি দেয়। পেছনে দাঁড়ানো নাসিমা হাততালি দেয় না। তার ছেলে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফি দিতে পারেনি।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “আপনার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছে। আপনি কী এ বিষয়ে কিছু বলবেন?”

ভাই হাসেন। “অভিযোগ থাকতেই পারে। তদন্ত হোক। সত্য বেরিয়ে আসুক। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।”

সাংবাদিক আবার বলেন, “তদন্ত হলে আপনি সহযোগিতা করবেন?”

“অবশ্যই, কারণ আমি তো বললামই, আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।”

ভাইয়ের হাসি এত সুন্দর যে, মুহূর্তের জন্য সাংবাদিকেরও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে।

সভা শেষে কুদ্দুস ভাইয়ের গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ভাই গাড়িতে ওঠার আগে তার কপালে আঙুল দিয়ে ছোট্ট একটা টিপ দেন। মানে কুদ্দুছকে একটু আদর করেন আরকি। কুদ্দুছ একেবারে যেন মাখনের গলে গলে পড়ে, হাত কচলাতে থাকে সমানে। 

“কাজকর্ম ঠিকমতো করিস কইলাম।”

কুদ্দুসের মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই টিপ তার কাছে পদক পাওয়ার মতো। পানখাওয়া তরমুজের বিচির মতো দাঁতের সব কটি বিস্তৃত করে শুধু বলতে থাকে, ‘জি ভাই, জি ভাই, আপনি যা বলবেন।’

রহিম পাশ থেকে বলে, “ভাই আপনাকে খুব স্নেহ করেন দেখছি।”

কুদ্দুস গর্বিত গলায় বলে, “ভাই মানুষ চিনতে পারেন।”

রহিম চায়ের কাপ ধুতে ধুতে বলে, “তা পারেন। কে কতটা ভয় পায়, সেটাও মনে হয় ভালো বোঝেন।”

কুদ্দুস কথাটার উত্তর দেয় না।

পরদিন সকালে খবর আসে, ভাইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হচ্ছে। বাজারে চাপা গুঞ্জন। কেউ বলছে, এবার কিছু একটা হবে। কেউ বলছে, এসব কিছু না। বিকেলে কুদ্দুসকে দেখা যায় বাজারের মোড়ে একা বসে থাকতে।

রহিম চা এগিয়ে দিয়ে বলে, “কী ভাই, মন খারাপ?”

“ভাই কয়েক দিন এলাকার বাইরে থাকবেন।”

“আপনি যাবেন না?”

“দেখি।”

রহিম একটু ভেবে বলে, “আপনি চাইলে আমার দোকানে কাজ করতে পারেন।”

কুদ্দুস তাকায়। “চা বানাতে পারব না।”

“শিখে নেবেন।”

“মানুষ আমাকে কী বলবে?”

রহিম হেসে বলে, “মানুষ তো এখনো আপনাকে কাজ না করেই অনেক কিছু বলে। কাজ করলে অন্তত নতুন কিছু বলবে।”

কুদ্দুস চুপ করে থাকে।

ঠিক তখনই একটি দামি গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নতুন একজন লোক নামেন। সঙ্গে দুজন যুবক। লোকটি বাজারের চারদিকে তাকিয়ে কুদ্দুসকে ডাকে।

“আপনি কুদ্দুস?”

“জি।”

“আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। এখন থেকে এলাকার কিছু দায়িত্ব আপনাকে দেখতে হবে।”

কুদ্দুসের মুখে আবার সেই পরিচিত হাসি ফিরে আসে।

লোকটি তার কপালে আঙুল ছোঁয়ান। তারপর বলেন, “আমরা একসঙ্গে কাজ করব।”

কুদ্দুস রহিমের দোকানের দিকে একবার তাকায়। রহিম তখন চায়ের কাপে চিনি দিচ্ছে।

কুদ্দুস নতুন লোকটির সঙ্গে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

রহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “মানুষের কপাল বড় অদ্ভুত জিনিস। কেউ সেখানে ঘাম মোছে, কেউ টিপ দেয়।”

নাসিমা পাশ থেকে বলে, “আর কেউ কেউ কপাল চাপড়ায়।”

রহিম তাকায়। “আপনি কোন দলে?”

নাসিমা তার সবজির ঝুড়ি গুছিয়ে বলে, “আমি কোনো দলেই নেই ভাই। আমার কপালে শুধু ছেলের স্কুলের ফি।”

কথাটা বলে সে হাঁটতে শুরু করে।

বাজারে সন্ধ্যা নামে। কুদ্দুস নতুন ভাইয়ের গাড়িতে বসে আছে। ভাই স্নেহের ভঙ্গিতে তার কপালে আঙুল ছোঁয়ান।

“চিন্তা করিস না। তুই আমার লোক।”

কুদ্দুসের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কপালে কোনো রং নেই, তবু সে যেন টিপ পরে আছে। এই টিপ তাকে পরিচয় দেয়, নিরাপত্তা দেয়, অন্যের পকেটে হাত দেওয়ার সাহস দেয়। বিনিময়ে তাকে শুধু ভাইয়ের কথা শুনতে হয়।

এদিকে নাসিমা ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফিরছে। পরীক্ষার ফি জোগাড় হয়নি।

ছেলে জিজ্ঞেস করে, “মা, কুদ্দুস চাচাকে সবাই ভয় পায় কেন?”

নাসিমা বলে, “কারণ তার মাথার ওপর একজন বড় মানুষ আছেন।”

“আমাদের মাথার ওপর কেউ নেই?”

নাসিমা ছেলের হাত আরও শক্ত করে ধরে। উত্তর দেয় না।

পরদিন সকালে কুদ্দুস আবার বাজারে আসে। তার কপালে সেই অদৃশ্য টিপ, মুখে সেই পরিচিত হাসি। নাসিমার ঝুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে বলে, “খালা, ভাইয়ের সালাম নিয়েন।”

নাসিমা এবার তার চোখের দিকে তাকায়।

“বাবা, সালামটা রাখো। আমার ছেলের পরীক্ষার ফিটা দিতে পারবে?”

কুদ্দুস থমকে যায়। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করে।

নাসিমা ছেলেকে নিয়ে স্কুলের দিকে রওনা হয়।

বাজারে লোকজন আবার বেচাকেনা শুরু করে। ক্ষমতার টিপ কপাল থেকে কপালে ঘুরতে থাকে। শুধু নাসিমার ছেলের কপালে কোনো টিপ পড়ে না।

কারণ এ বাজারে টিপ পাওয়ার যোগ্যতা মানুষের ভালো হওয়া নয়, ক্ষমতাবানের লোক হওয়া।

লন্ডন, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬