তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ, উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী—প্রবাসীদের সতর্কতা জরুরি

দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ, উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী—প্রবাসীদের সতর্কতা জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৪ অক্টোবর: দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩১৬, আক্রান্ত লাখ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিকে, দেশে ফিরতে যাওয়া প্রবাসীদেরও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৯৭ হাজার ২৯৬ জন। অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৭১ জন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৭৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৪ জন। একই সময়ে মারা গেছেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার পাঁচজন, খুলনা বিভাগের দুজন এবং চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের একজন করে রয়েছেন। ওই ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৯৬৫ জন।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন, জুনে ২ হাজার ৯০৬ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সেপ্টেম্বরে মারা গেছেন ১৪৮ জন। আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই ৭১ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন। পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, শুক্রবারের জুমার খুতবায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা প্রচার এবং সরকারি আবাসিক এলাকা ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আক্রান্তের সংখ্যা বেশি—এমন এলাকাগুলোতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী।

এর ধারাবাহিকতায় বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় দেশবাসীকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কারের আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রত্যেকে সপ্তাহে দুই দিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় দিলেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে উল্লেখ করে তিনি বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব ও পানির পাত্র নিয়মিত পরীক্ষা করে পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সদস্যদের সম্পৃক্ত করার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় আড়াই কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। বিএনসিসি, স্কাউটস, গার্ল গাইডস ও রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারেন। এসব সংগঠনের সদস্যরা প্রায় এক মাস ধরে শনিবার বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রবাসীদের দেশে ফেরার আগে বাড়িঘর পরিষ্কারে সতর্কতা জরুরি

যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ছুটি কাটাতে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশে ফেরেন। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় দেশে আসার আগে তাঁদের বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা নির্মাণসামগ্রীতে বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে।

দেশে ফেরার আগে পরিবারের সদস্য, বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক বা বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে বাড়ির ভেতর ও বাইরের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ছাদ, নালা, ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার ও পানির পাত্রও পরীক্ষা করা জরুরি। দিনের বেলাতেও এডিস মশা কামড়াতে পারে। তাই দেশে অবস্থানকালে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং জানালা-দরজায় মশা প্রতিরোধী জাল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

দেশে অবস্থানের সময় জ্বর দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। যাঁদের নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়, তাঁরা প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি সঙ্গে রাখতে পারেন। ভ্রমণবিমা থাকলে বাংলাদেশে চিকিৎসার ব্যয় এর আওতায় পড়ে কি না, সেটিও আগেই যাচাই করে নেওয়া ভালো।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িঘর ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। দেশে থাকা পরিবার ও বিদেশ থেকে ফিরে আসা প্রবাসী—সবার সচেতন অংশগ্রহণ ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সহায়ক হতে পারে।