‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

আমেরিকায় বাঙালিরা করলো ইউনূসকে হেনস্তা, সরকার কি নিচ্ছে ব্যবস্থা?

আমেরিকায় বাঙালিরা করলো ইউনূসকে হেনস্তা, সরকার কি নিচ্ছে ব্যবস্থা?

ডেস্ক রিপোর্ট, ১৪ অক্টোবর : বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সমালোচকদের ভাষায় ‘মবের জনক’ হিসেবে খ্যাতি অর্জনকারী নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেই একধরনের মবের মুখে পড়লেন। যে বাংলাদেশে তাঁর শাসনামলে মব সহিংসতা, গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই ইউনূসকেই এবার নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে একদল প্রবাসী বাংলাদেশির স্লোগান ও তোপের মুখে পড়তে হলো। ইতিহাসের এই পরিহাস নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিমানবন্দরের ঘটনাটিকে সরাসরি মব সহিংসতা বলা হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘটনার প্রকৃতি ও তদন্তের ওপর।

ঘটনাটি ঘটে ১২ অক্টোবর স্থানীয় সময় সোমবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। হুইলচেয়ারে বসা ইউনূসকে ঘিরে ধরে একদল ব্যক্তি উচ্চস্বরে স্লোগান দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁদের কয়েকজনকে ইউনূসকে লক্ষ্য করে ‘সন্ত্রাসী’ বলে সম্বোধন করতে এবং ‘এখানে কেন এসেছেন’ বলে প্রশ্ন তুলতে শোনা যায়। পরিস্থিতির মধ্যে ইউনূস ও তাঁর সঙ্গীরা বিমানবন্দরের ভেতরে ফিরে যান। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। তবে প্রত্যেকের ভূমিকা এবং কারও বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়।

সরকার কী নিচ্ছে ব্যবস্থা?

ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার নিন্দা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৩ অক্টোবর জানায়, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরবে, যাতে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। তিনি ঘটনাটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে অবস্থান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইউনূসের সফর ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি, মবের হাতে মৃত্যু, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এসব ঘটনায় সরকারের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রশ্নও উঠেছিল।

সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, সেই সময় মব সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, নিউইয়র্কের ঘটনাটি তার সঙ্গে তুলনা করে দেখার সুযোগ দিয়েছে। তবে বিমানবন্দরে স্লোগান ও মৌখিক আক্রমণের ঘটনা এবং বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাণঘাতী মব সহিংসতা এক ধরনের ঘটনা নয়। তুলনা করতে হলে উভয় ক্ষেত্রের প্রকৃতি, মাত্রা ও পরিণতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকে কাউকে হেনস্তা করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কোনো সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতার দায় নির্ধারণেও তথ্য, তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন। ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে; কিন্তু সেই সমালোচনা যেন ব্যক্তিগত হুমকি বা বেআইনি আচরণে পরিণত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘোষণা আছে, কিন্তু ব্যবস্থা কত দূর?

১৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে বিষয়টি জোরালোভাবে তোলার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ কাউকে গ্রেপ্তার করেছে, মামলা করেছে কিংবা তদন্তের ফল প্রকাশ করেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ জানিয়েছে—এ কথা বলা যায়; কিন্তু কার্যকর আইনি ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইউনূসকে বিমানবন্দরে কে বা কারা হেনস্তা করল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বিদেশের মাটিতে সংঘটিত এমন ঘটনার ক্ষেত্রে সরকার কতটা কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কত দূর এগোয়। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরীক্ষা সবার ক্ষেত্রেই সমান হওয়া উচিত।