ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

সৌদিতে টানা হামলা: সৌদিগামী ১০০ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, বিপাকে ১৫,৩৯৩ যাত্রী , বাড়ছে হতাহত; ভিসা ও চাকরি নিয়ে উদ্বেগ

সৌদিতে টানা হামলা:  সৌদিগামী ১০০ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, বিপাকে ১৫,৩৯৩ যাত্রী , বাড়ছে হতাহত; ভিসা ও চাকরি নিয়ে উদ্বেগ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৪ অক্টোবর :

সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ঢাকা থেকে সৌদিগামী ও সৌদি আরব হয়ে চলাচলকারী ১০০টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে প্রবাসী কর্মী, ওমরাহযাত্রীসহ ১৫ হাজার ৩৯৩ জনের ভ্রমণ ব্যাহত হয়েছে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাঁদের মধ্যে চাকরি হারানো ও সৌদিতে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারার উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্যের বরাতে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।

১০০টি ফ্লাইটের মধ্যে ৪১টি সরাসরি, ৫৯টি ট্রানজিট

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি ফ্লাইটের মধ্যে ৪১টি সরাসরি এবং ৫৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি এবং রিয়াদ এয়ার ও সৌদিয়া এয়ারলাইনসের সাতটি করে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, সালামএয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজের সাতটি করে, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার দুটি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইটের সূচি ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে যাত্রীদের বিকল্প ফ্লাইটে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে আসনসংকটের কারণে অনেকেই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।

রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইটে স্থগিতাদেশ

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ ও ঢাকা-দাম্মাম রুটের ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে।

যেসব যাত্রীর জরুরি ভ্রমণ প্রয়োজন, তাঁদের জেদ্দা বা মদিনা হয়ে যাওয়ার বিকল্প বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। তবে বিকল্প রুটের ফ্লাইটে আসন পাওয়া নিশ্চিত নয়। যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরের হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, আহত ২৭

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে প্রবাসী কর্মী ও ওমরাহযাত্রী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

হুথিদের নতুন হামলার হুমকি, জ্বালানি স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু

রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় আরও হামলার হুমকি দিয়েছে। প্রতিবেদনে সৌদি আরামকোর ধাহরান সদর দপ্তরে হামলার পর অগ্নিকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির কথাও বলা হয়েছে।

সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় বিমান চলাচল এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে হামলার প্রতিটি ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা আলাদাভাবে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে প্রবাসীদের দুশ্চিন্তা

ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন যেসব বাংলাদেশি কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তাঁদের চাকরি, নিয়োগদাতার সঙ্গে চুক্তি এবং কর্মস্থলে যোগদানের সময়সীমা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

ওমরাহযাত্রী ও দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও বিপাকে

বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে শুধু সৌদিগামী কর্মীরাই নন, ওমরাহযাত্রী এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বিকল্প ফ্লাইটে আসন পাওয়া, টিকিট পরিবর্তন এবং যাত্রার নতুন তারিখ নির্ধারণ নিয়ে তাঁদের ভোগান্তি হচ্ছে।

বেবিচক এয়ারলাইনসগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ফ্লাইটের পরিবর্তিত সময় জানানো, বিকল্প বুকিং বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যাত্রীদের টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও প্রভাব

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশটির আন্তর্জাতিক আয়োজনেও। রয়টার্সের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবের ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলন হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি উপস্থিত হওয়ার পাশাপাশি দূর থেকেও যোগ দিতে পারেন।

যাত্রীদের জন্য জরুরি পরামর্শ

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সৌদিগামী যাত্রীদের ফ্লাইটের সময়সূচি নিশ্চিত না করে বিমানবন্দরে না যাওয়াই ভালো। ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হলে এয়ারলাইনসের কাছ থেকে বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা, টিকিট পরিবর্তন কিংবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের নিয়ম জেনে নিতে হবে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নিয়োগদাতা, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।

বেবিচকের বরাতে ১৪ অক্টোবরের সর্বশেষ পাওয়া এই হিসাবে, ১০০টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় ১৫ হাজার ৩৯৩ জন যাত্রীর ভ্রমণ ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বদলাতে পারে।