বাংলাদেশে রাজস্ব ঘাটতির চাপ ও উচ্চাভিলাষী বাজেটের ঝুঁকি: বাস্তবতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে অর্থনীতিতে

বাংলাদেশে রাজস্ব ঘাটতির চাপ ও উচ্চাভিলাষী বাজেটের ঝুঁকি: বাস্তবতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে অর্থনীতিতে

ঢাকা প্রতিনিধি, ২৩ এপ্রিল: 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একদিকে রাজস্ব আহরণের নতুন রেকর্ড, অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ঘাটতি—এই দুই বিপরীত চিত্র এখন নীতিনির্ধারণের সামনে কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। গত অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থার মধ্যেই আগামী অর্থবছর (২০২৬–২৭) জন্য প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি—যা দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতির চাপা সংকট

বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি একাধিক চাপে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে ৯ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির।

ব্যাংক খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি হওয়ায় আর্থিক খাতের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট, যা শিল্প ও উৎপাদন খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান কাঠামোয় রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।জাহিদ হাসান মনে করেন, প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে অর্জনযোগ্য নয়।

তাঁর মতে, “অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বর্তমান সক্ষমতায় যে পরিমাণ কর ও ভ্যাট সংগ্রহ করা সম্ভব, তার বাইরে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থায়নের জন্য অতিরিক্ত ঋণ বা অর্থ ছাপানোর দিকে যেতে হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।”

বাজেট কি বাস্তবসম্মত হচ্ছে?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভাব্য বাজেটে ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর বড় নির্ভরতা থাকবে। ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতোমধ্যে সরকারি ঋণের চাপ বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে। এতে বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি

শিল্প ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি আস্থা ও বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা হওয়া উচিত। তপন চৌধুরী মনে করেন, করের চাপ না বাড়িয়ে বরং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

তাঁর মতে, “যদি তরুণদের জন্য দেশে কাজের সুযোগ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ তৈরি না হয়, তাহলে মেধা বাইরে চলে যাবে। বাজেটকে তাই কর্মসংস্থান ও আস্থার নীতিগত কাঠামো হতে হবে।”

অতীতের বাজেট বাস্তবায়ন প্রশ্নে

গত এক দশকে প্রতি বছর বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। অনেক বছরই ঘোষিত বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বড় বাজেটের সংস্কৃতি কার্যত কাগুজে পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক দুর্বলতা মিলিয়ে আগামী বাজেট হবে একটি কঠিন পরীক্ষার সময়। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপের মধ্যে রয়েছে।

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—বাজেট কি বাস্তব অর্থনীতির সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হবে, নাকি আগের মতোই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের বোঝা নিয়ে শুরু থেকেই চাপের মুখে পড়বে?

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বাজেট কেবল সংখ্যার বড়ত্ব নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্যতা, আস্থা পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।