প্রবাসী বিনিয়োগের স্বপ্ন-বাস্তবতার টানাপড়েন

সিলেটে ৪৩ বছরের পুরোনো ওভারসিজ সেন্টার সিলগালা

সিলেটে ৪৩ বছরের পুরোনো ওভারসিজ সেন্টার সিলগালা

সিলেট প্রতিনিধি, ২২ এপ্রিল:

সিলেটে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, কেনাকাটা ও সেবা-নির্ভর একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার অবশেষে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ টানাপড়েন, ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধ এবং ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা—সব মিলিয়ে এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগ এখন কার্যত ইতিহাসের পাতায় চলে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. পারভেজের নেতৃত্বে নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থিত এই ভবনটি সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে ভবনটির নিচতলায় থাকা ১৮টি দোকানও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযান চলাকালে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নেন।

প্রবাসীদের কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু

১৯৭৮ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফয়েজ উল্লাহ প্রবাসীদের জন্য একটি সমন্বিত সেবা ও বিনিয়োগ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তার পরিকল্পনায় গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার ট্রাস্ট’। পরবর্তীতে সরকারি অর্থায়ন ও প্রবাসীদের সহায়তায় জিন্দাবাজার এলাকায় এই ভবন নির্মাণ শুরু হয়।

১৯৮২ সালে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনসহ ভবনটির নির্মাণ কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়ে তৃতীয়তলা পর্যন্ত ওঠে। নিচতলা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় মোট ১৭টি পজিশন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল—প্রবাসীদের বিনিয়োগ, তথ্যসেবা এবং আবাসনের একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নের কাঠামো স্থবির হয়ে পড়ে।

অব্যবস্থাপনা ও ভাড়া বিতর্ক

দীর্ঘ চার দশকে ভবনটির যথাযথ সংরক্ষণ বা আধুনিকায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নামমাত্র ভাড়ায় দোকান ও পজিশন ব্যবহার করে আসছিলেন বন্দোবস্ত গ্রহীতারা।

সম্প্রতি সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ভাড়া পুনর্নির্ধারণ এবং বকেয়া আদায়ের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নতুন করে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পজিশন হস্তান্তরের জন্য নোটিশও দেওয়া হয়।

তবে বন্দোবস্ত গ্রহীতারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চুক্তি নবায়নের দাবি তোলেন। এক পর্যায়ে তারা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন।

ধাপে ধাপে খালি, শেষ পর্যন্ত সিলগালা

নোটিশের পর দ্বিতীয় তলার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থান ত্যাগ করলেও নিচতলার ১৮টি দোকান কার্যত থেকে যায়। এতে প্রশাসনের সঙ্গে জটিলতা আরও বাড়ে।

শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে পুরো ভবনটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. পারভেজ বলেন, “জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বন্ধ করা হয়েছে এবং নিচতলার সব দোকান সিলগালা করা হয়েছে।”

একটি প্রকল্পের পতন না নতুন শুরুর ইঙ্গিত?

এই ঘটনাকে শুধু একটি প্রশাসনিক উচ্ছেদ হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এটি সিলেটের প্রবাসী নির্ভর অর্থনৈতিক অবকাঠামোর একটি বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

প্রবাসীদের জন্য পরিকল্পিত একটি কেন্দ্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেন তার উদ্দেশ্য হারাল, কেন রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি, এবং কেন এত বছর ধরে নীতিগত সমাধান আসেনি—এসব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।

একদিকে নিরাপত্তা ও ঝুঁকির যুক্তি, অন্যদিকে জীবিকা ও বিনিয়োগের বাস্তবতা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারের ভবিষ্যৎ।

এখন প্রশ্ন একটাই—এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কি একটি অনিয়মিত অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি নতুন কোনো পরিকল্পনার সূচনা?