দক্ষ কর্মীর সংকটে জার্মানি: সমাধানে ভারতের বিশাল জনশক্তির দিকে নজর

দক্ষ কর্মীর সংকটে জার্মানি: সমাধানে ভারতের বিশাল জনশক্তির দিকে নজর

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২৪ মার্চ:

জার্মানির অর্থনীতি বর্তমানে এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মুখে—দক্ষ কর্মীর ঘাটতি। দেশটির বিপুল সংখ্যক বয়স্ক কর্মী ধীরে ধীরে অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু সেই শূন্যস্থান পূরণের মতো পর্যাপ্ত তরুণ কর্মশক্তি দেশীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিল্প ও সেবা খাতের গতি ধরে রাখতে জার্মানিকে এখন বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে, আর এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠছে ভারত।

বার্লিনভিত্তিক থিংকট্যাংক বেরটেলসম্যান ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। তা না হলে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটির মোট শ্রমশক্তি প্রায় ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় হুমকি।

এই সংকটের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্পে। মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প তার অন্যতম উদাহরণ। একসময় যেখানে ২০০২ সালে জার্মানিতে ১৯ হাজার পারিবারিক মাংস ব্যবসা ছিল, ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ হাজারে। স্থানীয় তরুণদের মধ্যে এ ধরনের কঠোর পরিশ্রমনির্ভর পেশার প্রতি অনীহা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভর করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে জার্মানির কর্মসংস্থান সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ কর্মী নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। জার্মানির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তখন কর্মী সংকটে দিশেহারা ছিল, ফলে ভারতের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাব দ্রুত গ্রহণ করা হয়।

ভারতের বিশাল তরুণ জনসংখ্যা এ ক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা। দেশটিতে ২৫ বছরের নিচে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নতুন কর্মী শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ভারতের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে জার্মানি ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি পার্টনারশিপ’ চুক্তি বিষয়টিকে আরও সহজ করেছে। এর ফলে দক্ষ ভারতীয়দের জন্য জার্মানিতে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে জার্মানি সরকার ঘোষণা দেয়, ভারতীয়দের জন্য দক্ষ কর্মসংস্থান ভিসার কোটা বছরে ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৯০ হাজার করা হবে।

পরিসংখ্যানও এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৫ সালে জার্মানিতে ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজারেরও বেশি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জনসংখ্যাগত বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন—এই দুইয়ের মিলনেই জার্মানি এখন ভারতের দিকে ঝুঁকছে। একদিকে জার্মানির শ্রমঘাটতি, অন্যদিকে ভারতের উদ্বৃত্ত জনশক্তি—এই সমীকরণ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে।