যুক্তরাষ্ট্র ‘অপমানিত’ হচ্ছে ইরানের কূটনৈতিক কৌশলে—জার্মান চ্যান্সেলর মের্জের মন্তব্যে নতুন উত্তেজনা
ডেইলি ভয়েস অব পিপল | ইউরোপ ডেস্ক:
জার্মানির চ্যান্সেলর Friedrich Merz যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান পরোক্ষ আলোচনাকে কেন্দ্র করে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, ইরানের নেতৃত্বের কূটনৈতিক কৌশলের কাছে যুক্তরাষ্ট্র “অপমানিত” হচ্ছে এবং আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনকে বারবার বোকা বানানো হচ্ছে।

মের্জের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন Donald Trump প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থা ক্রমেই বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত একাধিক পরোক্ষ বৈঠক কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। এমনকি একটি বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance নেতৃত্ব দিলেও সমাধান আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী। ট্রাম্প সম্প্রতি ফক্স নিউজকে বলেন, “সব কার্ড আমাদের হাতে আছে। ইরান চাইলে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।” কিন্তু মের্জের বক্তব্য সেই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।
তিনি জার্মানির মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “ইরানিরা অত্যন্ত দক্ষভাবে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদে নিয়ে যাচ্ছে, আবার কোনো ফল ছাড়াই ফিরিয়ে দিচ্ছে। একটি পুরো দেশকে ইরানের নেতৃত্ব—বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডস—অপমানিত করছে।”
এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ ইউরোপীয় মিত্ররা অনেকদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন প্রস্তাব ইরানের
অন্যদিকে, ইরান নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে যেখানে পারমাণবিক ইস্যু বাদ দিয়ে প্রথমে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে ইরানকে “সেবা ফি” দিতে হতে পারে—যা আন্তর্জাতিক আইনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তবে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (IMO) স্পষ্টভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, “আন্তর্জাতিক নৌপথে কর বা ফি আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব ইরানের কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আগে যেখানে তেল-গ্যাস রপ্তানি ইস্যুকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো, এখন তেহরান অর্থনৈতিক চাপের মুখে নতুন অবস্থান নিচ্ছে।
চাপের মুখে ইরান, কৌশল বদলের ইঙ্গিত
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে ইরানের অর্থনীতি ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার দামকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাশিয়া ইরানকে সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।
তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের এই ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালী ছাড়া ইরানের বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বিশ্লেষণ: নতুন সংকটের দিকে বিশ্ব রাজনীতি
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব এখন শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্য নিরাপত্তার বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপ, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো এই সংঘাতে নতুনভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় কূটনৈতিক সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।