২৭ এপ্রিল: আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ কলাম
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১১ ।। স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন নাম—শব্দদূষণ; হারিয়ে যাচ্ছে নীরবতার অধিকার
উৎসর্গ
সেই মানুষদের, যারা প্রতিদিন শব্দের ভিড়ে নিজেদের ভেতরের শান্তিকে হারিয়ে ফেলছেন

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ন, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার বিস্তার, অব্যাহত নির্মাণকাজ এবং উচ্চমাত্রার বিনোদনমূলক শব্দ—সব মিলিয়ে শব্দদূষণ আজ এক নীরব বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে আনতেই প্রতি বছর এপ্রিলের শেষ বুধবার পালিত হয় International Noise Awareness Day। ১৯৯৬ সালে Center for Hearing and Communication–এর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই দিবস কেবল একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি আমাদের সময়ের এক গভীর সংকটের প্রতি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা।

World Health Organization–এর মতে, শব্দদূষণ এখন পরিবেশগত দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাস্থ্যঝুঁকি। অথচ এটি এমন এক দূষণ, যা আমরা দেখতে পাই না—শুধু সহ্য করি। শহরের কোলাহল আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা আর প্রশ্নই তুলি না: এই শব্দ কি আমাদের ধ্বংস করছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম শব্দদূষিত শহর হিসেবে পরিচিত। যেখানে আবাসিক এলাকায় শব্দমাত্রা ৫৫ ডেসিবেলের মধ্যে থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে তা প্রায়ই ৮০ থেকে ১১০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। যানবাহনের অবাধ হর্ন, পরিকল্পনাহীন নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানার শব্দ এবং লাউডস্পিকারের অপব্যবহার—সব মিলিয়ে শহরটি যেন এক অবিরাম শব্দযন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষ বেঁচে আছে কিন্তু শান্তি হারিয়ে ফেলেছে।

লন্ডন মহানগরীর একটি রাস্তা
আমরা লন্ডন–এর মতো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শহরে বসবাস করি। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য গাড়ি চলে, মানুষের ঢল নামে, উন্নয়নকাজ চলতেই থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে—এই ব্যস্ততার মাঝেও শব্দের এমন তীব্র চাপ অনুভূত হয় না। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো এখানে প্রায় অনুপস্থিত; জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ শব্দ তৈরি করে না। সবকিছু যেন এক নীরব শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে চলছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়ে দেয়—শব্দদূষণ উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী ফল নয়; এটি নিয়ন্ত্রণের বিষয়, সংস্কৃতির বিষয়, দায়িত্ববোধের বিষয়।
অতি উচ্চ শব্দ মানুষের শরীর ও মনের ওপর যে ধরনের ক্ষতি করে, তা অনেক সময় আমরা উপলব্ধিই করি না। দীর্ঘ সময় ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দে থাকলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ১০০ ডেসিবেলের উপরে শব্দ হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, এমনকি বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর—তাদের মনোযোগ কমে যায়, শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, শব্দদূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আমরা শব্দকে সমস্যা হিসেবে দেখতেই শিখিনি। হর্ন বাজানো আমাদের কাছে স্বাভাবিক, উচ্চস্বরে অনুষ্ঠান আমাদের কাছে সংস্কৃতি, আর নির্মাণকাজের শব্দ আমাদের কাছে উন্নয়নের চিহ্ন। এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া কোনো সমাধান সম্ভব নয়।
এভাবে লন্ডনের সব রাস্তায় শত শত গাড়ি চলে নিরবে, শব্দহীন
নীরবতা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। যেমন আমরা বিশুদ্ধ বাতাস চাই, তেমনি আমরা নীরব পরিবেশও চাই। কারণ নীরবতা ছাড়া মনোযোগ তৈরি হয় না, সৃজনশীলতা বিকশিত হয় না, মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে না।
সমাধানের পথ একেবারে বন্ধ নয়। কঠোর আইন প্রয়োগ, সাইলেন্ট জোন বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজে শব্দনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং লাউডস্পিকারের নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন জরুরি—অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা, অন্যের শান্তিকে সম্মান করা এবং শব্দের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া।
শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি শব্দের ভেতরে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ব, নাকি আমরা নীরবতার অধিকার পুনরুদ্ধার করব? কারণ শব্দ কেবল বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেও আঘাত করছে। আর সেই ভেতরের ভাঙন যদি আমরা এখনই থামাতে না পারি, তবে একদিন হয়তো আমরা এমন এক সমাজে দাঁড়াবো, যেখানে উন্নয়ন থাকবে, শব্দ থাকবে—কিন্তু মানুষ তার ভেতরের শান্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে।