কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংসতা: সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া নিহত, কর্মচারী গুরুতর আহত

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংসতা: সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া নিহত, কর্মচারী গুরুতর আহত

ঢাকা প্রতিনিধি, ৫ মার্চ:  কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিকেলের শেষ আলো নামার আগেই নেমে এলো অন্ধকার। ইফতার মাহফিলের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল সমাজকল্যাণ বিভাগ। হাসি-আড্ডা, ব্যস্ততা, আয়োজন—সবকিছু মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল রক্তাক্ত এক ঘটনার অভিঘাতে।

বুধবার বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায়, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২২৬ নম্বর কক্ষে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। একই ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমান-কে।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ঈমাম জানান, জরুরি বিভাগে আনার সময় শিক্ষক জীবিত ছিলেন। তবে ওয়ার্ডে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মাথায় উপর্যুপরি আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। আহত কর্মচারীকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়েছে; তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ঘটনাটি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন বিভাগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন চলছিল। বেলা তিনটায় অফিস শেষ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তখনো বিভাগে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ চেয়ারম্যানের কক্ষ থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে নিচতলায় থাকা আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী ছুটে যান। বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাধাক্কি করেও সাড়া না পেয়ে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে দেখা যায়, আসমা সাদিয়া রুনার নিথর দেহ পড়ে আছে। আর ফজলুর রহমান নিজের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।

বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, ফজলুর রহমান প্রায় আট-নয় বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে সমাজকল্যাণ বিভাগে কাজ করছিলেন। সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে তাঁর সঙ্গে বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়ার বাক্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। অনেকেই ধারণা করছেন, সেই ক্ষোভ থেকেই এ নৃশংস ঘটনা ঘটতে পারে। তবে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত কারণ নিশ্চিত করেনি।

রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। ট্রলিতে রাখা আসমা সাদিয়ার মরদেহ ঘিরে স্বজনদের আহাজারি। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে অচেতন হয়ে পড়েন তাঁর স্বামী ইমতিয়াজ পারভেজ, যিনি কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইংরেজি বিষয়ের ইনস্ট্রাক্টর। স্বজনদের সান্ত্বনা যেন কোনো কাজে আসছিল না; কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি বারবার।

চার সন্তানের জননী ছিলেন আসমা সাদিয়া। বড় মেয়ে তাইবার বয়স মাত্র নয় বছর, ছোট মেয়ে আয়েশার বয়স এক বছর। মায়ের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে দুই শিশু বারবার বলছিল, “আম্মু কই? আমি আম্মুর কাছে যাব।” সেই আর্তনাদ উপস্থিত সবার হৃদয় বিদীর্ণ করে দেয়। হাসপাতালের করিডরজুড়ে তখন শুধু কান্নার শব্দ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহীনুজ্জামান জানান, চিৎকার শুনে আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। পরে দ্রুত নিরাপত্তা সেলের সদস্য ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়। তিনি বলেন, ভেতরে শিক্ষকের নিথর দেহ পড়ে ছিল, আর কর্মচারী সামান্য নড়াচড়া করছিলেন।

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে দুটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে এবং একাধিক আলামত জব্দ করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষকের কক্ষ ও করিডরে কোনো ক্যামেরা ছিল না; নিচতলার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার আগে-পরে কারা চলাচল করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন প্রাথমিকভাবে ধারণা দিয়েছেন, শিক্ষককে হত্যার পর কর্মচারী আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে জ্ঞান, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা হওয়ার কথা—সেই প্রাঙ্গণেই এমন রক্তাক্ত পরিণতি। ইফতারের আয়োজন যেখানে মিলনের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ছড়িয়ে পড়ল শোকের ছায়া।

আসমা সাদিয়া রুনার অকালপ্রয়াণ শুধু একটি বিভাগের নয়, একটি পরিবারের, চারটি শিশুর এবং সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রইল। তদন্ত শেষ হলে হয়তো জানা যাবে ঘটনার প্রকৃত কারণ। কিন্তু যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কোনো তদন্তের প্রতিবেদনে পূরণ হবে না।