কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৬।। দূরের যুদ্ধ, কাছের সংকট: বাংলাদেশের সামনে নতুন বাস্তবতা

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৬।। দূরের যুদ্ধ, কাছের সংকট: বাংলাদেশের সামনে নতুন বাস্তবতা

উৎসর্গ


বিশ্বের নানা প্রান্তে কর্মরত সেই সব প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে, যাদের পরিশ্রমের রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরে

মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থিরতার আগুনে জ্বলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সামরিক উত্তেজনা এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি দ্রুতই বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তার প্রভাব পুরো বিশ্বে পড়বে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে হলেও অর্থনৈতিকভাবে সেই অঞ্চলের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জ্বালানি আমদানি, শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সেখানে যুদ্ধ শুরু হলে তার ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এসে আঘাত হানে। অতীতে গালফ যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতেও আমরা সেই বাস্তবতা দেখেছি।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস এই অঞ্চল থেকে সরবরাহ হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। যদি এই পথ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে বা যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর।

ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা শুরু হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের সরবরাহব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এসব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ যেসব সমস্যায় পড়তে পারে :

১. জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি – আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়বে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

২. রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা ও প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা – বাংলাদেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ওইসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে, ফলে অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, সারা বিশ্বে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে বসবাস করেন। ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নত দেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির হয়ে পড়ে, তখন সেই দেশগুলোর অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়। ফলে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ প্রবণতাও হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমে গিয়ে অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৩. রপ্তানি খাতে অনিশ্চয়তা – বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হলে পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।

৪. খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি – যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে গম, ভুট্টা ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্যবাজারে।

৫. বিশ্ববাণিজ্যের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া – সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হলে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৬. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ কমে যাওয়া – বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ দেশের অর্থনীতি এখনও বহির্বিশ্বের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। জ্বালানি, খাদ্যশস্য এবং শিল্পের কাঁচামাল—সব ক্ষেত্রেই আমদানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করা। জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজা, খাদ্য মজুত বাড়ানো এবং রপ্তানি বাজারকে বৈচিত্র্যময় করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরির কৌশলও গ্রহণ করতে হবে।

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য তাই এসব সংকটকে দূরের কোনো ঘটনা বলে মনে করার সুযোগ নেই।

দূরের এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছেই সংকট হিসেবে ফিরে আসতে পারে। তাই এখনই বাস্তবতা বুঝে প্রস্তুতি নেওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ৫ মার্চ, ২০২৬