কলিকালের কলধ্বনি : ৪২ ।। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়েও কেন দেশে  শিক্ষার আলো সবার ঘরে পৌঁছালো না ?

কলিকালের কলধ্বনি : ৪২ ।। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়েও কেন দেশে  শিক্ষার আলো সবার ঘরে পৌঁছালো না ?

বাংলাদেশ বহু দূর এগিয়েছে—এটা আমরা গর্বের সঙ্গেই বলি। কিন্তু পরিসংখ্যান সামনে আসলেই বোঝা যায়, আমাদের অগ্রগতির পথ এখনো কতটা অসমান ও অসম্পূর্ণ। হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে ২০২৫-এর সর্বশেষ তথ্য বলছে—দেশের ৪২.৪৫ শতাংশ মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা এখনো প্রাথমিকের নিচে। এর মধ্যে ২৩.৫১ শতাংশ কখনো বিদ্যালয়ের মুখই দেখেনি, আর ১৮.৯৪ শতাংশ পাঁচ শ্রেণীও পেরোতে পারেনি


এত সরকারি প্রকল্প, এনজিও উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহায়তা মিলেও এই বাস্তবতা আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন তোলে—স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পর আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে?

শিক্ষার এই অবস্থার কারণ জানতে চাইলে শিক্ষাবিদরা বলেন—পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নে ঘাটতি বেশি। প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু তার কার্যকারিতা যাচাই, মনিটরিং ও মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি দুর্বল। বিশেষভাবে বড় যে সমস্যা, তা হলো—আমরা এখনো শিক্ষাকে পরিবার, সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে সমন্বয় করতে পারিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যথার্থই বলেছেন, “শিক্ষা এককভাবে নয়, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। না হলে প্রকল্প থাকলেও কার্যকর ফল পাওয়া যায় না।” অর্থাৎ দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধান না হলে, পরিবারগুলো শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও গভীরভাবে উপলব্ধি করবে না—ফলে শিক্ষার উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে এগোবে না।

এখনো দেশের নানা অঞ্চলে বৈষম্য ভয়াবহ। যেমন—বান্দরবানে ৩৪.১০ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণ নিরক্ষর, আর দারিদ্র্যের হার ৬৫.৩৬ শতাংশ। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম, শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের, যাতায়াত ব্যয় বেশি—ফলে ঝরে পড়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি। শুধু স্কুল নির্মাণ নয়—এখানে স্থানীয় বাস্তবতার সাথে মানানসই বিকল্প শিক্ষা-ব্যবস্থা না আনলে উন্নতি অসম্ভব।

একটি দেশ তখনই এগোয়, যখন তার মানুষগুলো সমানভাবে এগিয়ে যায়। কিন্তু জনগণের অর্ধেক যদি শিক্ষার প্রথম সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে উন্নয়ন হবে বৈষম্যের, বঞ্চনার।
আরও উদ্বেগজনক হলো—১৮–২০ কোটি মানুষের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকার বিক্রি মাত্র ৫০ হাজার কপি! তাতেই বোঝা যায় জ্ঞানচর্চার অবস্থা কোথায়।
এখন লাইব্রেরিতে যায় না—অথচ আমাদের সময়ে ১৪ বছর বয়সেই অনেকেই নিয়মিত লাইব্রেরিতে পড়তে যেত। আমরাও যেতাম। শিক্ষিত (বিএ/এমএ পাশ) মানুষের মাঝেও এখন পড়ার অনীহা দেখা যায়। কেউ কিছু জানতে চাইলে বলে—“অমুক বলেছে”, “তমুকের কাছ থেকে শুনেছি”—কিন্তু সে 'তমুক' নিজেই কতটুকু পড়াশোনা করে, তারও ঠিকানা নেই!

অনেকে উচ্চশিক্ষিত হয়েও জানেন না—কীভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে হয়, কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, কোন অনুষ্ঠানে কোন পোশাক মানানসই ইত্যাদি অনেক কিছু। এত দুর্বল সাধারণ জ্ঞান নিয়ে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন—যা দেশ পরিচালনার জন্য কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ নয়।

এই পরিসংখ্যান আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট—যদি সত্যিই চোখ খোলা থাকে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কারণ শিক্ষা কেবল ব্যক্তিকে নয়—সমগ্র জাতিকে বদলে দেয়। তাই শিক্ষা যে জাতির মেরুদণ্ড—এটা কেবল রূপক নয়, বাস্তব সত্য। ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে মানুষ যেমন দাঁড়াতে পারে না, তেমনি অর্ধশিক্ষিত সমাজ নিয়ে একটি জাতিও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।

আমরা বিলাতে থাকি—এই দেশ উন্নত হয়েছে কারণ তারা শতভাগ শিক্ষিত, এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সবসময় তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আর আমরা এখনো সেই জায়গায় বহু দূরে… আর লিখে লাভ নেই—মেজাজ চড়ে যাচ্ছে!

এখন প্রয়োজন কিছু বাস্তব, লক্ষ্যভিত্তিক ও জরুরি পদক্ষেপ—

১. দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
বৃত্তি, স্কুল-ফিডিং, পোশাকসহ বিভিন্ন প্রণোদনা বাড়াতে হবে, যাতে স্কুলে যাওয়া পরিবারের ওপর বোঝা না হয়।

২. শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ও বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন
শুধু ভর্তি নয়—মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; না হলে ঝরে পড়া কমবে না।

৩. তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা
যে এলাকার সমস্যা যেটা, সে অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে। একটি প্রকল্প দিয়ে সারা দেশের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

৪. সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন
পরিবারকে বুঝাতে হবে—শিক্ষা চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া।
একসময় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দুইজন নিরক্ষর মানুষকে লেখাপড়া শেখানো বাধ্যতামূলক ছিল; সরকার চাইলে আবার সেই কার্যকর ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। কলেজ/বিশিববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দিয়ে সরকার আবার এ প্রকল্প চালু করতে পারে।

দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সেইদিনই হবে—যেদিন দেশের শেষ মানুষটিও শিক্ষার আলো নিজের ঘরে পৌঁছে দিতে পারবে।

সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক।

লন্ডন, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫