পবিত্র ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯১ ।। ঈদ হোক আনন্দ ও আত্মজাগরণের উৎসব

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯১ ।।  ঈদ হোক  আনন্দ ও আত্মজাগরণের উৎসব

উৎসর্গ

সকল মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষকে –

যাঁরা ঈদকে শুধু আনন্দের দিন হিসেবেই দেখেন না, বরং এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিক সম্পর্কে সচেতন 

আজ পবিত্র পালিত হচ্ছে যুক্তরাজ্যসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে। কলামের শুরুতে ভয়েস অব পিপল এর সকল পাঠক এবং সকল শ্রেনীর জনগনকে জানাচ্ছি ঈদ মোবারক। 

ঈদ—শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আনন্দময় চেহারা, নতুন জামা-পোশাক, কোলাকুলি আর মিষ্টি মুখ। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক অর্থ। ‘ঈদ’ অর্থ উৎসব, আর ‘ফিতর’ অর্থ ভেঙে দেওয়া। দীর্ঘ এক মাস রোজা-সিয়াম সাধনার পর সংযম ভেঙে আনন্দে ফিরে আসাই ঈদুল ফিতরের আসল অর্থ। এটি শুধু খাদ্য গ্রহণের আনন্দ নয়, বরং আত্মজাগরণ, শুদ্ধতা ও মানবিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন।

ঈদ উৎসবের সূচনা নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে। মদিনায় হিজরতের পর, হিজরী দ্বিতীয় সালে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) মুসলমানরা প্রথমবার ঈদ উদযাপন করেন। তখন থেকে দুই ধরনের ঈদ—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—ইসলামের অন্যতম সামাজিক ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান হিসেবে চালু হয়। নবী (সা.) ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন এবং শিশুদের সঙ্গে বিশেষভাবে সময় কাটাতেন। বদর যুদ্ধের পরে মুসলমানরা প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন, যা ছিল সত্যের বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে সংযুক্ত।

বাংলাদেশে মুসলিমদের মধ্যে ঈদ উৎসবের সূত্রপাত ঘটে মূলত সুফি-দরবেশ ও তুর্কি-আরব বণিকদের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের দিক থেকে দেখা যায়, হিজরী ৩৪১ সালে (৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) ঢাকায় শেখউল খিদা আগমন করেন। পরবর্তীতে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা ও বাবা আদম শহীদ সেন আমলে ইসলাম প্রচার এবং ধর্মীয় উৎসবের ধারাবাহিকতা স্থাপন করা হয়। এই সময় থেকেই বাংলায় রোজা, নামাজ ও ঈদের প্রাথমিক রীতি চালু হয়।

বাংলায় মুসলিম শাসকদের আমলে ঈদ উৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকায় প্রথম স্থায়ী ঈদগাহের নির্মাণ ঘটে ১৬৪০ সালে ধানমির “শাহী ঈদগাহ”-এ। এটি বাংলার সুবাদার সম্রাট শাহ সুজার নির্দেশে তৈরি হয়। নবাব, উচ্চপদস্থ আমির ও জনসাধারণ এই ঈদগাহে একত্রিত হতেন, নামাজ আদায় করতেন এবং আনন্দে অংশগ্রহণ করতেন। ঈদ উদযাপনকে আরও প্রাণবন্ত করতে নবাব মুর্শিদ কুলি খান ১৭২৯ সালে ত্রিপুরা জয় উদযাপনের সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থ বিতরণ করেছিলেন, যা ঈদের মূল চেতনার প্রতিফলন—ভাগাভাগি, সহমর্মিতা ও সমাজের দরিদ্র মানুষের প্রতি যত্ন।

নবাবী আমলে ঈদ উদযাপন ছিল এক বিশাল সামাজিক মিলনমেলা। ঢাকার নিমতলি প্রাসাদ থেকে চকবাজার, হোসেনি দালান হয়ে প্রাসাদে ফিরে আসা শোভাযাত্রা, রাস্তার দুই পাশে সাধারণ মানুষদের মধ্যে অর্থ বিতরণ, এবং সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আতশবাজি—এসব ছিল ঈদের অপরিহার্য অংশ। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সাধারণ মানুষ সমবেত হতেন চাঁদ দেখার জন্য। নবাব বাড়ির ছাদ থেকে চাঁদ দেখার পর তোপধ্বনি, সাইরেন এবং হর্ন বাজিয়ে ঈদকে স্বাগত জানানো হতো।

ঈদের আনন্দ শুধু বাহ্যিক আনন্দে সীমাবদ্ধ ছিল না। চাঁদ দেখা, নতুন জামা-কাপড়, আতশবাজি এবং খাবারের আয়োজন—এসব সামাজিক মিলনের সঙ্গে যুক্ত। বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে রোজার শেষের দিন ঈদের জন্য অপেক্ষা করা, একসাথে নামাজ পড়া, অতিথি আপ্যায়ন—এসব অভ্যাস আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ স্পর্শ করত।

কিন্তু আজকের দিনে প্রযুক্তি, ভোগবাদের প্রবণতা এবং আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ঈদের ঐতিহ্যকে অনেকটা ক্ষীণ করে দিয়েছে। এখন ঈদ অনেকটাই টেলিভিশন, মোবাইল বা সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার ঐতিহ্য কমে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ঈদের প্রকৃত চেতনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—সংযম, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই এক দিনের আনন্দ কেবল নিজের জন্য নয়। এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। যাকাতুল ফিতর নিশ্চিত করে, দরিদ্র মানুষও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। অর্থাৎ ঈদ কেবল আনন্দের নয়, সহমর্মিতার প্রতীক।

আজকে ২০ মার্চ, যখন যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের মুসলিম বিশ্ব ঈদ উদযাপনের আনন্দে মুখর, তখন মধ্যপ্রাচ্যে চলছে তেলের লড়াইয়ে চরম উত্তেজনা। একদিকে মিলছে আত্মশুদ্ধির রমজান ও ঈদের উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক সংকট ও শক্তির লড়াইয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় কেঁপে উঠছে। চাঁদ দেখা এবং মিষ্টি মুখের আনন্দের মধ্যে এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঈদ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের দিন নয়, বরং শান্তি, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের চেতনা বজায় রাখার প্রতীক। বিশ্বের কোন কোন অংশে আজও মানুষ নিরাপদ ঈদ উদযাপন করতে পারছে না, সেই চিন্তা আমাদেরকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে বাধ্য করে।

সুতরাং ঈদকে আমরা কেবল নতুন পোশাক, খাবার বা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এক আত্মজাগরণের দিন হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। রমজানে অর্জিত সংযম, সততা ও মানবিকতাকে বাকি বছরও ধরে রাখার প্রয়াস করলে, প্রতিটি দিনও ঈদের মতো আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ঈদ শুধু উৎসব নয়—এটি এক আত্মশুদ্ধি, সামাজিক বন্ধন ও সত্যের বিজয়ের উদযাপন।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২০ মার্চ ২০২৬