আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ কলাম
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৮ ।। বিশ্ব নারী দিবস : উদযাপন নয়, অসমাপ্ত লড়াইয়ের স্মরণ
উৎসর্গ
“বৈষম্য, সহিংসতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করা পৃথিবীর সকল সাহসী নারীকে’’

আজ ৮ মার্চ। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ফুল, শুভেচ্ছা, সেমিনার, সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য বার্তা—সব মিলিয়ে দিনটি যেন নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যাপনের আড়ালে আমরা কি সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসটিকে যথেষ্ট মনে রাখি, যার ভেতর থেকে নারী দিবসের জন্ম?

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা কোনো উৎসবের মধ্য দিয়ে নয়; বরং শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে শিল্প বিপ্লবের যুগে নারী শ্রমিকেরা অমানবিক কর্মপরিবেশ, কম মজুরি এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে হাজার হাজার নারী শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন—কর্মঘণ্টা কমানো, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে। সেই আন্দোলনের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আজকের নারী দিবসের বীজ।
পরবর্তীতে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী Clara Zetkin আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ধারণা সামনে আনেন। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে তার প্রস্তাব সমর্থন পায়। এরপর ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই দিবস পালিত হতে শুরু করে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারীরা “রুটি ও শান্তি”-র দাবিতে ধর্মঘট শুরু করলে ইতিহাস নতুন মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের ফলেই নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করেন এবং ৮ মার্চ তারিখটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্থায়ী হয়ে যায়।
পরে ১৯৭৫ সালে United Nations আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ প্রায় সব দেশেই এটি পালিত হয়—কখনও রাষ্ট্রীয় আয়োজনে, কখনও সামাজিক উদ্যোগে, কখনও বা ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার প্রকাশে।
এই দিবসের একটি প্রতীকী রঙও রয়েছে—বেগুনি, সবুজ এবং সাদা। বেগুনি বোঝায় ন্যায় ও মর্যাদা, সবুজ আশার প্রতীক, আর সাদা বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই রঙগুলো প্রথম জনপ্রিয় করে তুলেছিল যুক্তরাজ্যের নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সংগঠন Women’s Social and Political Union। বিশেষ করে বেগুনি রঙ এখন বিশ্বজুড়ে নারীর প্রতিবাদ ও ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ইতিহাসের আলোচনার বাইরে আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। নারী দিবস যতই উদ্যাপন করা হোক, বিশ্বের বহু নারী এখনও সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা প্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভোগেন। হতাশা, উদ্বেগ, গর্ভকালীন বিষণ্নতা কিংবা মেনোপজ-সংক্রান্ত মানসিক চাপ—এসব বিষয় এখনও অনেক সমাজেই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ নারীর মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার শিকারও নারীরাই বেশি। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু সংকট—প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব নারীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। তবুও সমাজের অর্থনীতি, পরিবার এবং সংস্কৃতির ভিত দাঁড়িয়ে থাকে নারীর অদৃশ্য শ্রমের ওপর।
বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন—
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
এই পংক্তি কেবল কবিতার সৌন্দর্য নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সত্যেরও প্রতিফলন। মানবসভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির পেছনে নারী ও পুরুষের যৌথ অবদান রয়েছে।
তবে নারী দিবসকে ঘিরে আরেকটি বিভ্রান্তিও ক্রমশ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই দিনটিকে কেবল একটি প্রতীকী উৎসবে সীমাবদ্ধ করা হয়—ফুল দেওয়া, শুভেচ্ছা জানানো কিংবা সামাজিক মাধ্যমে কিছু বার্তা পোস্ট করা। অথচ এই দিবসের মূল লক্ষ্য ছিল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা।
আজ ২০২৬ সালের নারী দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে—নারীর সম্মান কোনো বিশেষ দিনের বিষয় নয়। এটি একটি ধারাবাহিক সামাজিক চর্চা। পরিবার, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র—সবখানেই নারী ও পুরুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
নারী দিবস তাই কেবল উদ্যাপনের দিন নয়; এটি আমাদের আত্মসমালোচনার দিনও। আমরা কতটা এগিয়েছি, কোথায় পিছিয়ে আছি, এবং সামনে কোন পথে হাঁটতে হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার দিন।
কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সহজ—নারীকে পিছনে রেখে কোনো সমাজই সামনে এগোতে পারে না। আর মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদায় পাশাপাশি হাঁটে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৮ মার্চ, ২০২৬
Email: msnirjhor786@gmail.com