ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৯ ।। রাজনীতিতে চলছে গুপ্ত- সুপ্ত-বিলুপ্ত : দেশ গরমে উত্তপ্ত :

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৯ ।। রাজনীতিতে চলছে গুপ্ত- সুপ্ত-বিলুপ্ত :  দেশ গরমে উত্তপ্ত :

উৎসর্গ


সেই নীরব জনগণের প্রতি—
যাদের ঘামে দেশ চলে, কিন্তু যাদের কষ্ট
রাজনীতির উত্তপ্ত শব্দে হারিয়ে যায়

“কোথায় গুপ্ত, কোথায় সুপ্ত, কে বলে তা বহুদূর?
বাঙালির মাঝে, গুপ্ত-সুপ্ত, বাঙালিতেই সুরাসুর”

বাংলাদেশের প্রকৃতি এখন খুব উত্তপ্ত। চলছে গ্রীষ্মকাল। তার উপর চলছে ঘন্টায় ঘন্টায় লোড শেডিং। জনগন জ্বলে মরছে গরমে। তবুও সদ্য গঠিত নতুন সরকারকে তেমন কিছু বলছে না শরমে। তবে এই কষ্ট গিয়ে লাগছে মানুষের মরমে। তবে গরমে আর মরমে মিলে সাধারণ মানুষের অবস্থা চরমে। আবার রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছে কে, কার আমলে ছিল 'গুপ্ত', এখন আবার ওরাই কিভাবে হচ্ছে সুপ্ত, কোন দল এখন বিলুপ্ত-এসব আলোচনা।

তীব্র গরম আর রাজনীতির এই গুপ্ত, সুপ্ত আর বিলুপ্ত সব মিলিয়ে পুরো দেশই মনে হচ্ছে খুব উত্তপ্ত। নিজের স্বজাতি যে এত ‘পিকিউলিয়ার’, তা মনে ভেবে মাঝে মাঝে নিজেই হয়ে যাই উত্তপ্ত।

এই উত্তাপ এখন কেবল আবহাওয়ার নয়—এটি মনস্তত্ত্বেরও। গরমে ক্লান্ত মানুষ যেমন ছায়া খোঁজে, তেমনি রাজনীতির এই জটিল শব্দযুদ্ধেও মানুষ খুঁজছে স্বচ্ছতা। কিন্তু সেই স্বচ্ছতা মিলছে না, বরং ‘গুপ্ত’, ‘সুপ্ত’ আর ‘বিলুপ্ত’ শব্দের ভিড়ে সত্য আরও আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

লোডশেডিং আজকের বাংলাদেশে শুধু বিদ্যুতের ঘাটতি নয়, এটি এক ধরনের প্রতীক—অস্থিরতার প্রতীক। আলো আসে, আবার হঠাৎ চলে যায়। ঠিক তেমনি রাজনীতিতেও কখনো একটি পরিচয় সামনে আসে, আবার হঠাৎই তা আড়ালে চলে যায়। এই ওঠানামার মাঝেই জন্ম নিচ্ছে সন্দেহ, প্রশ্ন আর বিভ্রান্তি। এরই মাঝে মানুষ খুঁজে ফেরে শ্রান্তি।

রাজনীতির ময়দানে এখন ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি তকমা। এটি দিয়ে প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। কে কোথায় ছিল, কে কখন কীভাবে নিজেকে বদলেছে—এই হিসাব যেন আজ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক। অন্যদিকে ‘সুপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে এক ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাষা হিসেবে—যেখানে বলা হচ্ছে, সবসময় প্রকাশ্যে না থাকলেও ভিতরে সক্রিয়তা ছিল।

আর ‘বিলুপ্ত’? সেটি যেন এক ধরনের রাজনৈতিক হুমকি বা বাস্তবতা—যে শক্তি সময়ের সঙ্গে টিকে থাকতে পারেনি, অথবা হারিয়ে গেছে ক্ষমতার পালাবদলে। এই তিনটি শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বয়ান, যেখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—সব একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এই বিতর্ক সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ‘গুপ্ত’ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গেলো কয়েক দফা মারামারি। ভাবতে অবাক লাগে, ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদিন আমরাও পাশ করেছিলাম। এখনো পদচিহ্ন লেগে আছে সেখানে। আজ সেখানে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, অতীতের ভূমিকা এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। কিন্তু এই টানাপোড়েন যত বাড়ছে, ততই কমছে আস্থার জায়গা। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠছে আরও বিভক্ত, আরও সন্দেহপ্রবণ।

আমার নিজস্ব বিশ্লেষনে মনে হয়, এটি কেবল ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। যেখানে অবস্থান বদল, কৌশলগত নীরবতা এবং সুযোগ অনুযায়ী পরিচয় প্রকাশ—এসবই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু এখন যখন সেই বাস্তবতা প্রকাশ্যে আলোচনায় আসছে, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই উত্তাপ তৈরি করছে।

এই উত্তাপের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। তাদের কাছে ‘গুপ্ত’ বা ‘সুপ্ত’ তর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ কবে আসবে, জীবনযাত্রার ব্যয় কীভাবে কমবে, গাড়ির ভাড়া কবে আবার কমবে, আর আগামী দিন কতটা নিরাপদ হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের আলোচনায় যখন এসব প্রশ্নের চেয়ে শব্দের লড়াই বেশি জায়গা পায়, তখন মানুষের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব আরও বাড়ে।

শেষ পর্যন্ত সেই কবিতার লাইনেই ফিরে যেতে হয়—“বাঙালির মাঝে গুপ্ত সুপ্ত বাঙালিতেই সুরাসুর।” অর্থাৎ বিভাজন বাইরের নয়, ভেতরের। আর এই ভেতরের দ্বন্দ্বই আজকের রাজনীতিকে এত উত্তপ্ত করে তুলেছে।

দেশ আজ গরমে পুড়ছে, আর রাজনীতি শব্দে জ্বলছে। এই দুই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ শুধু অপেক্ষা করছে—কবে এই উত্তাপ কিছুটা হলেও কমবে। বিদেশে বসে স্বজাতির জন্য দোয়া করা আর লেখালেখি ছাড়া আর কিছু করার করার খুঁজে পাচ্ছি না। তবে জাতির জন্য আফসোস হচ্ছে। আর বিভিন্ন কারনে বিদেশের মাটিতে বসে আমাদের চিরজীবনই এ আফসোস করে যেতেই হবে দেখছি। 

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬