টাওয়ার হ্যামলেটস: বাঙালিদের শক্ত ঘাঁটিতে ‘চার বনাম বাকিরা’—মেয়র নির্বাচনে অনিশ্চয়তার নতুন সমীকরণ

টাওয়ার হ্যামলেটস: বাঙালিদের শক্ত ঘাঁটিতে ‘চার বনাম বাকিরা’—মেয়র নির্বাচনে অনিশ্চয়তার নতুন সমীকরণ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৫ এপ্রিল:

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস—যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তির এক প্রতীকী নাম। বহু বছর ধরেই এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব কার্যত বাঙালিদের হাতেই। বর্তমানে টানা তিনবারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লুৎফুর রহমান। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এবার সেই পরিচিত সমীকরণেই দেখা দিয়েছে নতুন উত্তাপ—একটি মেয়র পদে লড়ছেন চারজন প্রভাবশালী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী।

আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সারা দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখ এখন আটকে আছে টাওয়ার হ্যামলেটসেই। কারণ, এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দলীয় নয়—একই কমিউনিটির ভেতরেই তৈরি হয়েছে শক্ত প্রতিযোগিতা।

বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান (অ্যাসপায়ার পার্টি) ছাড়াও লেবার পার্টির প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের জামি আলী এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটসের মো: আব্দুল হান্নান—এই চার বাংলাদেশি প্রার্থী সরাসরি মেয়র পদের দৌড়ে রয়েছেন।

তবে লড়াই কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। কনজারভেটিভ পার্টির ডমিনিক নোলান, গ্রিন পার্টির হীরা খান, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট কোয়ালিশনের হুগো পিয়েরে, রিফর্ম ইউকের জন বোলার্ড এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্যারেন্স ম্যাকগ্রেনও মাঠে সক্রিয়। ফলে বহুজাতিক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনের ফলাফলকে করে তুলেছে অনিশ্চিত।

বাঙালিদের ভেতরেই প্রধান লড়াই

টাওয়ার হ্যামলেটস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সংখ্যার পাশাপাশি প্রভাবেও এই উপস্থিতি স্পষ্ট। তাই এবারের নির্বাচনেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বাঙালি প্রার্থীদের মধ্যেই—বিশেষ করে লুৎফুর রহমান ও সিরাজুল ইসলামের মধ্যে।

লুৎফুর রহমান

লুৎফুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন এক নাটকীয় যাত্রাপথ। সিলেটে জন্ম, শৈশবে যুক্তরাজ্যে আগমন, আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা এবং কমিউনিটি রাজনীতি থেকে উঠে আসা—সব মিলিয়ে তিনি একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক চরিত্র। ২০১০ সালে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ইতিহাস গড়া, ২০১৪ সালে পুনর্নির্বাচন, ২০১৫ সালে আইনি জটিলতায় পদ হারানো এবং পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা শেষে ২০২২ সালে আবারও নির্বাচিত হওয়া—এই উত্থান-পতন তাঁকে করেছে আরও আলোচিত। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বাস্তবায়ন করেছেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত্তিকে শক্ত করেছে।

সিরাজুল ইসলাম

অন্যদিকে সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে এসে জীবনের শুরুতে শ্রমজীবী পেশায় যুক্ত থাকলেও বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। লেবার পার্টির হয়ে টানা সাতবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর প্রচারণার মূল প্রতিশ্রুতি—নতুন পাঁচ হাজার ঘর নির্মাণ এবং হাউজিং খাতে বড় ধরনের সংস্কার।

বিভক্ত ভোট, বাড়তি ঝুঁকি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই কমিউনিটির চারজন প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে মাঝখান থেকে কোনো ভিন্ন পটভূমির প্রার্থী সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন—যা টাওয়ার হ্যামলেটসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারাকে বদলে দিতে পারে।

তবে ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো মনে করেন, শেষ পর্যন্ত মেয়র পদটি আবারও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কারও হাতেই থাকবে। কিন্তু সেই ‘কে’—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

শেষ দৃশ্য ৭ মে

টাওয়ার হ্যামলেটস এখন যেন এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। প্রতিদিন বদলাচ্ছে সমীকরণ, তৈরি হচ্ছে নতুন জল্পনা। অভিজ্ঞতার প্রতীক লুত্ফুর রহমান, পরিবর্তনের বার্তাবাহী সিরাজুল ইসলাম, নাকি নতুন কোনো মুখ—কে হবেন এই শক্তিশালী বোরোর পরবর্তী নেতা?

সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৭ মের ব্যালট বাক্সে। ততদিন পর্যন্ত পূর্ব লন্ডনের এই বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে—এটাই এখন নিশ্চিত।