ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ম্যাকবুক-ক্যামেরা উদ্ধার হয়নি, বাংলাদেশ সফরে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় জার্মান পর্যটক
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ৯ অক্টোবর :
তিনি নাটোরের ‘বনলতা সেন’ এর সন্ধানে সেখানে যাননি। গিয়েছিলেন বাংলাদেশ নামক অতিথিপরায়ণ দেশটাকে পরিভ্রমণ করতে। মানুষের জীবন দেখতে। কিন্তু হলেন ফতুর। মনটা হলো তার বেদনাবিদূর। সব হারিয়ে ফিরে এলেন ঢাকা। পকেট তখন পুরো ফাঁকা। এভাবেই হলো বাংলাদেশ নামক দেশটা দেখা।
বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে গত ৭ অক্টোবর নাটোর রেলস্টেশনে মূল্যবান সরঞ্জাম হারানো জার্মান তরুণ ক্রিল ল্যান্ডার চুরি যাওয়া ম্যাকবুক ও ক্যামেরা ছাড়াই রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরেছেন। প্রায় এক দিন ধরে পুলিশের একাধিক দল অনুসন্ধান চালালেও বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত তাঁর মালামাল উদ্ধার হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করার তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত তথ্য নেই। ঘটনাটি বাংলাদেশের রেলস্টেশনের নিরাপত্তা ও বিদেশি পর্যটকদের সহায়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

যেভাবে ঘটল চুরির ঘটনা
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মান নাগরিক ক্রিল ল্যান্ডার বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থান ঘুরতে এসেছিলেন। বগুড়ার বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ শেষে তিনি সান্তাহার থেকে ট্রেনে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও যাত্রাপথে তিনি নাটোর রেলস্টেশনে নেমে পড়েন।
গত ৭ অক্টোবর বিকেলে নাটোর স্টেশনের যাত্রী বিশ্রামকক্ষে অপেক্ষা করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ক্রিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি নিজেকে রেলওয়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। টিকিট কেনার জন্য টাকা তুলতে এটিএম বুথে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর ব্যাগটি ওই ব্যক্তির কাছে রেখে যান। ফিরে এসে দেখেন, লোকটি ব্যাগসহ উধাও।
ব্যাগে ছিল একটি অ্যাপল ম্যাকবুক ল্যাপটপ ও একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা। ক্রিল জানিয়েছেন, তাঁর পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন তাঁর কাছেই ছিল। তবে ল্যাপটপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যক্তিগত ডেটা সংরক্ষিত ছিল বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সিসিটিভিতে সন্দেহভাজন, তবু মেলেনি মালামাল
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাটোর রেলস্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এক যুবককে শনাক্ত করেছে। ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে এক যুবক ক্রিলকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় ১৬ মিনিট পর ওই যুবককে একটি ব্যাগ নিয়ে চলে যেতে দেখা যায় বলে রেলওয়ে পুলিশের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে ল্যাপটপের সম্ভাব্য অবস্থান প্রথমে রাজশাহীর রেলগেট এলাকায় এবং পরে একটি মহিলা কলেজের কাছাকাছি শনাক্ত হয়েছিল বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে ল্যাপটপের অবস্থান আব্দুলপুর রেলস্টেশনের আশপাশে দেখানোর তথ্যও পাওয়া যায়। এরপর তিতুমীর ও বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে তল্লাশি চালানো হলেও ল্যাপটপ বা ক্যামেরা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ল্যাপটপে সিম কার্ড না থাকায় সেটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানিয়েছেন, চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ অনুসন্ধানে যুক্ত হয় বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত মালামাল উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়নি।
পুলিশের সহায়তায় রাজশাহী, পরে ঢাকায় ফেরা
ঘটনার পর ক্রিল নাটোর সদর থানায় যান। কিন্তু ঘটনাটি রেলওয়ে পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তাঁকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। পরে নিরাপত্তার বিবেচনায় তাঁকে রাজশাহীতে নেওয়া হয়। সেখানে রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটি হোটেলে তাঁর থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করে পুলিশ।
৮ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে পদ্মা এক্সপ্রেসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পরদিন প্রকাশিত জাগো নিউজ ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও তাঁর ঢাকায় ফেরার তথ্য উঠে এসেছে।
ক্রিল সাংবাদিকদের জানান, ল্যাপটপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে এবং তিনি আশা করছেন পুলিশ মালামাল উদ্ধার করতে পারবে। রাজশাহীতে অবস্থানকালে পুলিশ যে সহযোগিতা দিয়েছে, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
দেশে বিদেশিদের পর্যটন নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে এলো:
প্রথমত, রেলস্টেশনে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? প্রথম শ্রেণির বিশ্রামকক্ষে একজন অপরিচিত ব্যক্তি নিজেকে রেলকর্মী পরিচয় দিয়ে যাত্রীর আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন বলে ভুক্তভোগীর বক্তব্য থেকে জানা যায়। স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের পরিচয় শনাক্ত করার সহজ ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের সচেতন করার উদ্যোগ থাকলে এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি পর্যটকের অভিযোগ গ্রহণ ও সহায়তা কতটা সহজ? ঘটনাটি কোন পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত, তা সাধারণ যাত্রীর কাছে সব সময় পরিষ্কার নাও থাকতে পারে। বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যোগাযোগের বদলে সমন্বিত সহায়তা দেওয়া গেলে তাঁর ভোগান্তি কমতে পারে। এ ঘটনা সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রভাব কতটা? বিদেশি পর্যটকেরা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অনলাইনে ভাগ করেন। ফলে এমন ঘটনা সম্ভাব্য পর্যটকদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে এই একটি ঘটনার কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক পর্যটন-ভাবমূর্তি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই পর্যটকেরা চুরি ও প্রতারণার শিকার হন। তাই বিচ্ছিন্ন একটি অপরাধের ভিত্তিতে পুরো দেশকে অনিরাপদ বলা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে গুরুত্বহীন ভাবারও সুযোগ নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত উদ্ধার অভিযান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটকের পাশে দাঁড়ানোই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
ক্রিল ল্যান্ডারের মালামাল উদ্ধার এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পাশাপাশি রেলস্টেশনের নিরাপত্তা, কর্মীদের পরিচয় যাচাই এবং পর্যটকদের জরুরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর নির্ভর করে না; ভ্রমণকারীরা কতটা নিরাপদ বোধ করেন এবং বিপদে পড়লে কত দ্রুত সহায়তা পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নাটোরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি সতর্কবার্তা।