‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

বাংলাদেশে প্রশিক্ষণহীন চালক ও বেপরোয়া অটোরিকশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি

বাংলাদেশে প্রশিক্ষণহীন চালক ও বেপরোয়া অটোরিকশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি

বাংলাদেশ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক, ৯ অক্টোবর :

বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বেপরোয়া গতি, হঠাৎ লেন পরিবর্তন ও ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এর মাশুল দিতে হচ্ছে পথচারী, যাত্রী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের। দুর্ঘটনায় কেউ হারাচ্ছেন হাত-পা, কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতা, আবার কোনো কোনো পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

৭২ বছর বয়সী আব্দুল মুক্তাদীর এরই এক নির্মম উদাহরণ। একসময় ব্যবসা ছিল, ছিল সচ্ছল সংসার। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর কেটে ফেলতে হয়েছে তাঁর ডান পা। চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে সঞ্চয়ের বড় অংশ। এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করাও কঠিন।

পাঁচ বছরের শিশু লাভলুও অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়েছে। অন্যদিকে নতুন চাকরির সন্ধানে সাভারের পথে বেরিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন বাবুল মিয়া। তাঁর চিকিৎসায় ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এসব ঘটনায় স্পষ্ট, একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষকে আহত করে না; বিপর্যস্ত করে দিতে পারে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি।

প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালকের আসনে

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন শুধু পাড়া-মহল্লার ছোট সড়কে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক এলাকায় প্রধান সড়কেও এসব যান চলাচল করছে। বেকারত্ব, কম আয় ও কাজের অনিশ্চয়তায় বিভিন্ন পেশার মানুষ অটোরিকশা চালানো শুরু করছেন। তাঁদের অনেকেরই নেই আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা যান চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা।

একসময় ঢাকায় ভ্যানে করে মাছ বিক্রি করতেন মুহিবিুর রহমান। ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় এখন অটোরিকশা চালান। তাঁর ভাষ্য, দুই-তিন দিন চালিয়েই তিনি শিখেছেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, জীবিকার প্রয়োজনে অনেকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের আগেই সড়কে নামছেন।

অটোরিকশা চালাতে শুধু গাড়ি চালানোর কৌশল জানলেই হয় না। নিরাপদে মোড় নেওয়া, অন্য যানবাহনকে পাশ কাটানো, পথচারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক সংকেত মানার মতো বিষয়ও জানা জরুরি। এসব বিষয়ে দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

হঠাৎ দিক পরিবর্তন, সংঘর্ষের আশঙ্কা

অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যত্রতত্র থামানো, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, বিপরীত পথে চলা ও দ্রুতগতিতে অন্য যানবাহনকে পাশ কাটানোর প্রবণতা। একই সড়কে ধীরগতির অটোরিকশার সঙ্গে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলায় সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিশেষ করে অটোরিকশা হঠাৎ সামনে চলে এলে বা আকস্মিকভাবে দিক পরিবর্তন করলে পেছনের যানবাহনের চালকের পক্ষে নিরাপদে গতি কমানো কঠিন হতে পারে। মোটরসাইকেল চালকেরা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকিতেও থাকেন।

তবে সব দুর্ঘটনার দায় অটোরিকশার ওপর চাপানোও যথাযথ নয়। চালকের আচরণ, সড়কের অবস্থা, অন্য যানবাহনের গতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি বিষয় তদন্ত করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

দেশে কত অটোরিকশা, নেই পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব যান স্বল্প দূরত্বে কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করেছে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যম হয়েছে। কিন্তু যথাযথ নিবন্ধন, চালকের পরিচয় শনাক্তকরণ ও কার্যকর নজরদারি না থাকলে নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের পরিচিতি এবং নির্ধারিত সড়কে চলাচলের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪ ধারায় নির্ধারিত লাইসেন্স ছাড়া জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানে মোটরযান চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন, শ্রেণিবিন্যাস, চালকের যোগ্যতা ও চলাচলের নিয়ম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞায় নয়

অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চালকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই, পরিচয় নিবন্ধন, প্রযোজ্য লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং যানবাহনের ব্রেক, আলো ও অন্যান্য নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি কোন সড়কে এসব যান চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে এবং কীভাবে গতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে অনুমোদনহীন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার সড়কে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি, আইন অমান্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং চালকদের জন্য সহজলভ্য প্রশিক্ষণও জরুরি।

তবে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত চালক, মালিক ও অন্যান্য কর্মজীবী মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান বা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজের সুযোগ না রেখে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।

এসব আহত নিহত মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশিক্ষিত চালক, নিরাপদ যানবাহন, সড়কভিত্তিক চলাচলবিধি ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মানুষের জীবিকার বাহন হবে, জীবনের জন্য হুমকি নয়—এই লক্ষ্যেই এখন প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি।