ভক্তদের মাঝে ছড়িয়ে নিরাশা, চলে গেলেন গানের পাখি আশা

ভক্তদের মাঝে ছড়িয়ে নিরাশা, চলে গেলেন গানের পাখি আশা

ভয়েস অব পিপল বিনোদন ডেস্ক: 

ভারতের কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়িকা আশা ভোসলে আর নেই। ৯২ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রোববার (১১ এপ্রিল) দুপুর ১২টার দিকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন তাঁর ছেলে আনন্দ ভোসলে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে পারিবারিক সূত্রে ‘চরম ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণ’-এর কথা জানানো হয়েছে।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভারতসহ পুরো উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। ভক্তদের মাঝে তৈরি হয়েছে এক শূন্যতা, যেন বহু দশকের সুরের যাত্রা হঠাৎ করেই থেমে গেল।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কিছুদিন ধরেই শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন তিনি। তাঁর নাতনি জানাই ভোসলে সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেন, চরম ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণের কারণেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

আশা ভোসলে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম বহুমুখী ও প্রভাবশালী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিত। আট দশকেরও বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি শুধু হিন্দি নয়, একাধিক ভারতীয় ভাষা এবং বহু বিদেশি ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, গজল, পপ কিংবা ক্যাবারে—সব ধরনের গানে তাঁর সাবলীল উপস্থিতি তাঁকে আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ-এও ভূষিত হন তিনি। একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড তাঁর ঝুলিকে করেছে সমৃদ্ধ।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সংগীতের এক কিংবদন্তি পরিবারে বেড়ে ওঠা—বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় ও নাট্যসংগীতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ছোটবেলা থেকেই সুরের আবহে বড় হন তিনি এবং অল্প বয়সেই সংগীতজগতে প্রবেশ করেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন গণপত রাও ভোঁসলে-কে। তবে পারিবারিক টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকট তাঁর জীবনকে কঠিন করে তোলে। পরবর্তীতে সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মন-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও বিবাহ তাঁর শিল্পীজীবনে নতুন অধ্যায় যোগ করে।

বড় বোন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকর-এর ছায়া পেরিয়ে তিনি নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন। লতা যেখানে ছিলেন ধ্রুপদী সুরের প্রতীক, সেখানে আশা হয়ে ওঠেন সাহসী, প্রাণবন্ত ও পরীক্ষানিরীক্ষার কণ্ঠ। ক্যাবারে থেকে পপ—সবখানেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

বাংলা গানের জগতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা গান—তাঁর কণ্ঠে যেন ভিন্ন এক প্রাণ পেত শ্রোতারা। পুজোর মৌসুমে তাঁর কণ্ঠ বাঙালির আবেগের অংশ হয়ে উঠেছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে নানা দুঃখ-কষ্ট তাঁকে বারবার আঘাত করেছে। সন্তানদের মৃত্যু, পারিবারিক বিচ্ছেদ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি থেমে যাননি। শেষ বয়সেও তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অনন্য প্রাণচাঞ্চল্য।

আজ তিনি নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অসংখ্য গান, রয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা সেই অমর কণ্ঠস্বর। সংগীতপ্রেমীদের কাছে আশা ভোসলে শুধু একটি নাম নয়—তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অনন্ত সুরের যাত্রা।