হৃদয় শরীরে থাকে না, কিছু হৃদয় থাকে ইতিহাসে

কলিকালের কলধ্বনি-৪৬ ।। ডাক্তার ফজলে রাব্বি : জাতির বিবেক, হৃদয় ছিঁড়ে নেওয়া এক মেধাবী ডাক্তার

কলিকালের কলধ্বনি-৪৬ ।।  ডাক্তার ফজলে রাব্বি : জাতির বিবেক, হৃদয় ছিঁড়ে নেওয়া এক মেধাবী ডাক্তার

বিজয়ের আনন্দ ঢাকার প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েনি তখনো। বারুদের গন্ধ, হতাশা, এবং নীরব কান্নার মধ্যেই শহর টিকে আছে। ১৮ ডিসেম্বর, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অগণিত লাশের ভিড়ে একটি দেহ ধরা পড়ে। দুই চোখ উপড়ে ফেলা, সারা শরীর বেয়নেটের ক্ষতচিহ্নে ভরে, হাত দুটো পেছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গি উরুর ওপরে আটকে রাখা। বুকের ভেতর—হৃদপিণ্ড আর কলিজা নেই।

এই লাশটি ছিল ডা. ফজলে রাব্বির—একজন চিকিৎসক, এক মানবিক হৃদয়, এবং একজন মহান মেধাবী।

তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর মস্তিষ্কের দাম দিয়ে পুরো পাকিস্তানকেই বিক্রি করা যেত, তবুও তার সমমূল্য হয়তো কেউ দিতে পারত না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএসে পাকিস্তান জুড়ে প্রথম হওয়া ছাত্র। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানের অধীনে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমআরসিপি—দুটি বিশেষায়ণে: ইন্টারনাল মেডিসিন এবং কার্ডিওলজি। দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে, যেখানে অল্প বয়সে হয়ে উঠেন সহকর্মীদের বিস্ময় ও ছাত্রদের অনুপ্রেরণা।

৩২ বছর বয়সে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। ৩৮ বছরে ল্যান্সেট ও ব্রিটিশ জার্নালে তাঁর কাজ আলোড়ন তোলে। পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক মনোনীত হলেও পুরস্কার গ্রহণ করেননি—কারণ তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা ছিল বাংলার মানুষ এবং স্বাধীন দেশের স্বপ্ন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দেশ ছাড়েননি। মেডিকেল কলেজের ওয়ার্ডে বসে আহত মানুষদের সেবা দিয়েছেন, পরিচয় গোপন রেখেছেন, নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে ওষুধ, অর্থ দিয়েছেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল মানুষ।

১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রী জাহানারা রাব্বি একই স্বপ্ন দু’বার দেখেছিলেন—সাদা চাদরে ঢাকা কিছু, চারটি কালো থামের মাঝে। ১৫ ডিসেম্বর সকালে স্বপ্নের কথা শুনে ডা. ফজলে রাব্বি হেসে বলেছিলেন,
“তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ।”

সেদিন সকালেই দেশের অবস্থা জানার জন্য ফোন করলেও কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। আকাশে উড়ছিল ভারতীয় যুদ্ধবিমান, দূরে বোমার শব্দ। দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ উঠলে তিনি বললেন, পুরান ঢাকায় এক অবাঙালি রোগীকে দেখতে যাবেন। স্ত্রী ভয় পেলেন। তিনি শুধু বললেন:
“ভুলে যেও না, সে মানুষ।”

দুপুরের খাবার ছিল আগের দিনের বাসি তরকারি, কিন্তু তিনি বলেছিলেন,
“আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।”

কিন্তু বিকেল আর তাঁর জন্য আসেনি। বাবুর্চি এসে জানাল—বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা। বাইরে কাদামাখা মাইক্রোবাস, একটি জিপ, এবং সৈন্যরা। খুব শান্ত গলায়, স্ত্রীর দিকে না তাকিয়ে তিনি বললেন,
“টিঙ্কুর আম্মা, ওরা আমাকে নিতে এসেছে।”

বিকেল চারটায় মাইক্রোবাসে চড়ে তিনি চলে যান। চার দিন পর, রায়েরবাজারে পাওয়া গেল তাঁর দেহ।

যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের হৃদয় বাঁচাতে কাজ করেছেন, সেই মানুষটির হৃদয় ছিঁড়ে নিয়েছিল নরপিশাচেরা। তারা ভেবেছিল, হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে ফেললেই হয়তো সব শেষ। কিন্তু তারা জানত না—কিছু হৃদয় শরীরে থাকে না, কিছু হৃদয় থাকে ইতিহাসে।

ডা. ফজলে রাব্বি আজ শুধু একজন শহীদ নন। তিনি আমাদের বিবেক, আমাদের মানবতা, আমাদের শেখান—মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

হাজার বছর পরও তিনি থাকবেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে, নীরবে কিন্তু অমর।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক।

লন্ডন, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫