ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি ঘোষণা, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক | ১৬ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আশাবাদের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়।
ফ্রান্সের এভিয়ান শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, হরমুজ প্রণালিও ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হচ্ছে।” তাঁর দাবি, এই সমঝোতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরবে, তেলের দাম কমবে এবং বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের সময় সেখানে নৌ অবরোধ ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হবে। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের প্রধান আলোচক উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
তবে চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অনির্ধারিত। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বাকি রয়েছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রমাণ দিতে পারলে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে। তবে আপাতত কোনো অর্থ ছাড় বা সম্পদ মুক্ত করা হয়নি।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে এই শান্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী চুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও স্পষ্ট করেছেন যে এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল তার নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না।
ইসরায়েলের ডানপন্থী জোটের একাধিক নেতা ইতোমধ্যে চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করে কোনো সমঝোতা টেকসই হবে না।
অন্যদিকে, তেহরানও সতর্ক বার্তা দিয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলবে। অন্যথায় পুরো চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান কোনো ধরনের ফি বা টোল আদায় করতে পারবে কি না, সেটিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো মুক্ত নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর ট্রাম্প দাবি করেছেন এই জলপথ “সম্পূর্ণ টোলমুক্ত” থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা তাৎক্ষণিক সংঘাত কমাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করলেও শান্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আচরণের ওপর।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুদ্ধ থামানোর ঘোষণা দেওয়া সহজ; কিন্তু টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।