তিন লাখ শরণার্থী ফেরাতে মিয়ানমারের সম্মতির দাবি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর

তিন লাখ শরণার্থী ফেরাতে মিয়ানমারের সম্মতির দাবি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৩০ জুলাই: 

দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মতি জানিয়েছে মিয়ানমার। পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের বিষয়েও নীতিগত সম্মতি দিয়েছে নেপিদো।

বুধবার (২৯ জুলাই) এক অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তার এই বক্তব্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রক্রিয়া বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ও তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর দাবি উঠলেও বাস্তবতা হলো—মিয়ানমার এতদিন তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাই সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, “অনেকে বলে তাদের ফেরত পাঠাও। কিন্তু পাঠাব কোথায়? মিয়ানমার তো তাদের নিতে চায়নি। এখন তারা প্রথম ধাপে পাঁচ হাজার জনকে গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে।”

তবে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর বিষয়ে মিয়ানমারের সম্মতির দাবি করলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে কি না, কিংবা প্রত্যাবাসনের জন্য কী ধরনের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে—তা পরিষ্কার নয়।

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের চাপ বাড়ছে

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। কিছুদিন আগে পেনাং রাজ্যের একটি আবাসন এলাকা ছেড়ে শতাধিক রোহিঙ্গা কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা নিরাপত্তা, বৈধ মর্যাদা ও উন্নত জীবনযাপনের দাবিতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।

পরে স্থানীয় প্রশাসন তাদের কুয়ালালামপুর, সেলানগোর ও পেনাংয়ের বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়। এর পরপরই মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার নতুন তথ্য সামনে আসে।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ প্রত্যাবাসনের বাস্তবায়ন

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ও পরে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে কক্সবাজার ও আশপাশের বিভিন্ন ক্যাম্পে ১৩ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু নাগরিকত্ব সংকট, নিরাপত্তার অভাব এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রত্যাবাসন বারবার আটকে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংখ্যার ঘোষণা নয়—রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাখাইনে তাদের স্বাভাবিক জীবন ফেরানোর পরিবেশ তৈরি করাই হবে প্রকৃত সমাধানের মূল বিষয়।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিলেও এখন বড় প্রশ্ন—মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর রোহিঙ্গারা সত্যিই কি নিরাপদে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবেন?