তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ব্রিটেনে আগামী বছর খাদ্যের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বাড়তে পারে, সতর্কবার্তা খুচরা বিক্রেতাদের
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৬ অক্টোবর :
যুক্তরাজ্যে আগামী বছর খাদ্যের দাম প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে খাদ্য ও খুচরা বিক্রয় খাতের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় চাপকে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টাইমস-এর আজকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগাম সতর্কতা পাওয়ার পরও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম (বিআরসি)। তবে প্রায় ৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি এখনো একটি পূর্বাভাস, নিশ্চিত পরিণতি নয়; সরকারের পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর প্রকৃত বৃদ্ধির মাত্রা নির্ভর করবে।
বিআরসির বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থায় পড়তে শুরু করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে খাদ্য কারখানা, হিমাগার, গুদাম এবং সুপারমার্কেট পরিচালনার খরচও বাড়ে। একই সঙ্গে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পণ্য পরিবহনকে ব্যয়বহুল করে তোলে। এসব অতিরিক্ত খরচের কিছু অংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেরা বহন করলেও দীর্ঘ মেয়াদে তার একটি অংশ ক্রেতাদের ওপর চাপতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
বিআরসির হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত খাদ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের পরিচালিত এক জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা আশঙ্কা করেছেন, এই সংঘাতের কারণে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। জরিপে ৮১ শতাংশ মানুষ জ্বালানি বিল বৃদ্ধি এবং ৭৬ শতাংশ মানুষ পেট্রল ও ডিজেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব পরিসংখ্যান মানুষের আশঙ্কার মাত্রা তুলে ধরে; এগুলো অবশ্য ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি পরিমাপ নয়।
খাদ্যের দাম বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কৃষিতে ব্যবহৃত সার। সার উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন বা দাম বৃদ্ধি হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। কৃষককে বেশি দামে সার, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হলে সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য ও খাদ্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ব্রিটেনের খাদ্যপণ্যের দাম ইতিমধ্যেই বাড়ছে, যদিও সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়েনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডপ্যানেল বাই নিউমেরেটরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চার সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের মুদি পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; আগের মাসের প্রতিবেদনে এই হার ছিল ২.৩ শতাংশ। পানি ও ফলের শরবতজাতীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে মাখন, পনির ও চকোলেটের দাম কমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সব ধরনের খাবারের ক্ষেত্রে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তও মূল্যবৃদ্ধির আলোচনায় এসেছে। বিআরসি বলেছে, গত দুই বছরে নিয়োগকর্তাদের জাতীয় বিমা অবদান বৃদ্ধি এবং জাতীয় জীবনযাত্রার মজুরি-সংক্রান্ত ব্যয়ের কারণে খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত ৬৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয় বহন করতে হয়েছে। এ ছাড়া নতুন প্যাকেজিং-সংক্রান্ত কর ও ফি বাবদ আরও ১৬০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি বা কাঁচামালের দাম কমলেও সরকারের নির্ধারিত এসব ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না। তাই খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নিজস্ব নীতির কারণে সৃষ্ট ব্যয়ও পর্যালোচনা করতে হবে।
বিআরসি সরকারের কাছে ব্যবসায়িক বিদ্যুৎ বিলের কিছু নীতিগত চার্জ কমানো, খাদ্য প্রস্তুতকারকদের ওপর নতুন পুষ্টিমান-সংক্রান্ত নিয়ম বাস্তবায়নের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং প্যাকেজিংয়ের ওপর আরোপিত বিভিন্ন ফি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে খুচরা বিক্রেতাদের ব্যয়ের চাপ কমতে পারে এবং ক্রেতাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কিছুটা সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
তবে মূল্যবৃদ্ধি কতটা হবে, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারের বাজার, আবহাওয়া, কৃষি উৎপাদন এবং সুপারমার্কেটগুলোর প্রতিযোগিতার ওপর। এর আগে ব্রিটিশ সুপারমার্কেটগুলোর মধ্যে মূল্য প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের বেশি দাম দিতে অনীহা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগাম ক্রয় ও মূল্য-সুরক্ষা কৌশল খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো। ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস, যাতায়াত ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর যাদের হাতে সীমিত অর্থ থাকে, তাদের জন্য মুদি পণ্যের অতিরিক্ত খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সম্মিলিত ব্যয় পারিবারিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এসব নির্দিষ্ট পণ্যের দাম ঠিক কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় ব্রিটেনের আসন্ন বাজেটকে ঘিরে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসায়িক ব্যয়ও কমাতে হবে। অন্যদিকে ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নেবে এবং সেই পদক্ষেপের সুফল সুপারমার্কেটের তাক থেকে কেনাকাটার সময় বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে।