ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৫ ।। সরকারের বয়স দিন ষাইট : এদিকে জনগণের অবস্থা টাইট

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৫ ।।  সরকারের বয়স দিন ষাইট : এদিকে জনগণের অবস্থা টাইট

“উৎসর্গ—

বাংলাদেশের নীরব সহনশীল জনগণকে,
যাদের কষ্টের শব্দ শোনা যায় না,
কিন্তু অনুভব করা যায় সর্বত্র।”

১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের দুইমাস অর্থাৎ ষাট দিন অতিক্রান্ত হলো। ক্ষমতায় আসার প্রথম কয়েক মাস—যে সময়টাকে সাধারণত “হানিমুন পিরিয়ড” বলা হয়—সেই সময়েই যদি সরকারকে এতগুলো সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সামনে পথ যে মসৃণ নয়, তা বলাই বাহুল্য। বরং বাস্তবতা এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সরকারের বয়স যতই বাড়ছে, জনগণের জীবন ততই সংকুচিত হয়ে “টাইট” হয়ে উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান শুরুটা করেছিলেন আশাজাগানিয়া কিছু উদ্যোগ দিয়ে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খালকাটা কর্মসূচি, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—এসব পদক্ষেপ জনমনে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছিল। এমনকি ব্যক্তিগত আচরণেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত—প্রটোকল কমানো, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, গাড়িবহর সীমিত করা—এসবই ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন দৃষ্টান্ত।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রাজনীতিতে প্রতীকী পরিবর্তন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তব জীবনের সংকট মোকাবিলা তার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি। আর সেই জায়গাতেই যেন বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ‘হামে’ আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে একাধিক শিশু। এটাও এখন আলোচনার একটা বড় ইস্যু। চাঁদাবাজদের যন্ত্রণায় অতিষ্ট জনগন। আবার বিদ্যুতের রোডশেডিং এর যন্ত্রনায় বিষিয়ে উঠছে জনগনের মন। রাস্তায় বেরুলে ছিনতাই, লুন্ঠন। ঘরে জ্বলছে ইলেকট্রিকের বদলে লন্ঠন। এভাবে বাঁচা যায় কতক্ষণ? ওদিকে এ অবস্থায় সরকার শোনাচ্ছেন আশার বাণী। কিন্তু জনগনের কাছে লাগছে সবই ‘ফানি’!

সবচেয়ে বড় সংকট এখন জ্বালানি খাতে। সরকার বলছে—মজুত আছে, সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবতা বলছে—পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন, তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়া মানুষ, পরিবহন খাতে অচলাবস্থা। এই “দাবি বনাম বাস্তবতা”-র দ্বন্দ্বই আজ জনগণের ক্ষোভের মূল উৎস। আজ এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারে এক লাফে ২১২ টাকা দাম বাড়ল।

যে দেশে এক ফিলিং স্টেশন থেকে সহজে তেল পাওয়া যেত, সেখানে এখন পাঁচ-ছয়টি পাম্প ঘুরেও প্রয়োজন মেটে না—এটা শুধু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, এটি নীতিনির্ধারণের দুর্বলতারও প্রমাণ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে, আর তার ঢেউ গিয়ে লাগছে বাজারে—নিত্যপণ্যের দামে।

লোডশেডিং পরিস্থিতিও একই রকম উদ্বেগজনক। রাজধানীর বাইরে গ্রাম ও মফস্বলে দিনে ১০-১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি কেবল অব্যবস্থাপনার নয়, বরং পরিকল্পনার অভাবের প্রতিফলন। বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার অস্থিরতা। চাল, তেল, ডিম, মুরগি—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। সরবরাহ-শৃঙ্খলের দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, আর সেই বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে কৃষক। বোরো মৌসুমে ডিজেল না পেলে সেচ বন্ধ হয়ে যায়, আর সেচ বন্ধ মানেই ফসল নষ্ট। সরকারের মজুতের হিসাব কৃষকের কোনো কাজে আসে না, যদি সে জমিতে পানি তুলতে না পারে।

অর্থাৎ, সরকারের সাফল্যের তালিকা যতই দীর্ঘ হোক, জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা যদি ভিন্ন হয়—তাহলে সেই সাফল্য রাজনৈতিকভাবে টেকসই হয় না।

রাজনৈতিক দিক থেকেও সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা, দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ, নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণ—এসব বিষয় সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—সহনশীলতার ঘাটতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার, বিরোধীদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ—এসব ঘটনা জনগণের মনে পুরোনো শাসনব্যবস্থার ভয়কে আবারও উসকে দিচ্ছে। যে পরিবর্তনের আশায় মানুষ ভোট দিয়েছে, সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন তারা দেখতে চায়—শুধু বক্তব্যে নয়, আচরণে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে—এটি সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কতটা ছিল? সংকটকে স্বীকার না করে, বারবার “সব ঠিক আছে” বলা—এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সরকারের ক্রমশ “বন্ধুহীন” হয়ে পড়া। যে বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকরা একসময় সমর্থন দিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন সমালোচনায় মুখর। এটি কোনো ষড়যন্ত্রের ফল নয়, বরং বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ, রাজনৈতিক সমর্থন কখনো স্থায়ী নয়—তা অর্জন করতে হয়, ধরে রাখতে হয় কাজের মাধ্যমে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—
সরকারের বয়স যতই বাড়ুক, যদি সংকট ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না বাড়ে, তাহলে জনগণের জীবন ততই সংকুচিত হবে।

এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি বাস্তবতা স্বীকার করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি সাফল্যের বর্ণনায় ডুবে থেকে সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে?

কারণ ইতিহাস বলে—
ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শুধু ভালো শুরু নয়, কঠিন সময় সামাল দেওয়ার সক্ষমতাই আসল পরীক্ষা।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১৯ এপ্রিল ২০২৬