রাজধানী থেকে জেলা–উপজেলা পর্যন্ত সহিংসতা, প্রশাসন নিরাপত্তা জোরদার করেছে

দেশজুড়ে অস্থিরতা: হাদির হত্যার প্রতিবাদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, জনজীবনে আতঙ্ক

দেশজুড়ে অস্থিরতা: হাদির হত্যার প্রতিবাদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, জনজীবনে আতঙ্ক

ভয়েস অব পিপল  রিপোর্ট, ২০ ডিসেম্বর:  ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর সিংগাপুর থেকে বাংলাদেশে পৌঁছার পর রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা–উপজেলায় ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দিনভর চলা সহিংসতায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করেছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ভাঙচুর ও আগুন নেভাতে গিয়ে দুই ফায়ারকর্মী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হয়েছেন।

সারা দেশে মহাতান্ডব ঘটে যাবার পর দেশের প্রশাসন রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও সেনা মোতায়েন করেছে। হাদির লাশ ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই শাহজালাল বিমানবন্দরসহ সর্বত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। লাশ বহনের রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ রাখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

যেভাবে ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয় :


গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ ডিসেম্বর রাত ৮টা ১৮ মিনিটে ফয়সাল ও তার সহযোগী কবির বাংলামোটরের ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে যান। প্রায় ছয় মিনিটের ওই সাক্ষাতে শরিফ ওসমান হাদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করা হয় এবং একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর ৯ ডিসেম্বর রাতে ফয়সাল পুনরায় ওই কেন্দ্রে যায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নতুন সহযোগী আলমগীর। সেখানে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে আলোচনা হয় এবং ওই বৈঠকের মাধ্যমেই ফয়সাল হাদির প্রচারণা টিমে যুক্ত হয়। পরদিন ১২ ডিসেম্বর সেগুনবাগিচায় হাদির প্রচারণায় সরাসরি অংশ নেয় তারা।

রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজে শুক্রবার ভোর ৫টা ২২ মিনিটে ফয়সাল ও আলমগীরের গাড়ি প্রবেশের দৃশ্য ধরা পড়ে। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া ও তার বোন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেখানে হাদির একটি ভিডিও দেখিয়ে ফয়সাল হামলার পরিকল্পনা প্রকাশ করে এবং ঘটনার পর সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

পরবর্তীতে বান্ধবীকে বাড্ডায় নামিয়ে দিয়ে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে আগারগাঁওয়ের বাসা থেকে মোটরসাইকেলে বের হয় ফয়সাল ও আলমগীর। তারা সরাসরি সেগুনবাগিচায় হাদির প্রচারণায় যোগ দেয়। দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে হাদি মতিঝিলের উদ্দেশে রওনা হলে অভিযুক্তরা তাকে অনুসরণ করতে থাকে।

দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে হাদিকে বহনকারী অটোরিকশা মতিঝিলের জামিয়া দারুল উলুম মসজিদের সামনে পৌঁছায়। সেখানে জুমার নামাজ আদায় করেন তিনি। নামাজ শেষে দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে সেখান থেকে রওনা দিলে অভিযুক্তরা আবারও পিছু নেয়। পরে মতিঝিল হয়ে পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে প্রবেশের পর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে খুব কাছ থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

আজ শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বাদ জোহর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তার মরদেহ সমাহিত করা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের উত্তরদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে।  শনিবার বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ওসমান হাদির জানাজা হবে। 

ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর সিঙ্গাপুর থেকে  পৌছার পর দেশের যেসব স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে : 

ঢাকা: কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পত্রিকার অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। ধানমন্ডির ছায়ানট ভবন এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি পুনরায় ভাঙচুরের শিকার হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাতভর আতঙ্ক বিরাজ করে; দোকানপাট বন্ধ থাকে, মানুষ ঘরে আটকে থাকে।

সিলেট: চৌহাট্টা এলাকায় বিভিন্ন সংগঠনের মিছিল ও বিক্ষোভ চলে। বারুতখানা এলাকায় প্রথম আলো অফিস, আল পাইন রেস্টুরেন্টে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। হাদির হত্যার প্রতিবাদে নগরী ও বিশ্বনাথ উপজেলায় মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম: খুলশীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয় ও বাসভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়।

রাজশাহী: কুমারপাড়ায় মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় এক্সকেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

ঝিনাইদহ: হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়কে যুবলীগ নেতা আশফাক মাহমুদের গার্মেন্ট দোকান, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদকদের বাসভবন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়।

হবিগঞ্জ: জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও ‘দৈনিক আমার হবিগঞ্জ’ পত্রিকার অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়।

বান্দরবান: সাবেক পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিংয়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়।

কুষ্টিয়া: মজমপুর গেট এলাকায় প্রথম আলো অফিসে ভাঙচুর হয়।

দিনাজপুর: বোচাগঞ্জ উপজেলার ধনতলা এলাকায় সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় অগ্নিসংযোগ হয়। সেতাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আসলাম হোসেনের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহ: ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মরদেহ উদ্ধার করে।

বগুড়া ও কুমিল্লা: ছাত্র-জনতা, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ হাদির হত্যার প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ করে। বাদ জুমা বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লার দাউদকান্দি, দেবিদ্বার ও আশুলিয়ায়ও বিক্ষোভ চলে।

নোয়াখালী, বরিশাল, বেনাপোল: সর্বদলীয় ঐক্যের উদ্যোগে হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার দাবিতে মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেয়—“বিচার চাই”, “হাদি হত্যার বিচার চাই”, “আমরা সবাই হাদি হবো”, “যুগে যুগে লড়ে যাবো”।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়—অগ্নিসংযোগ

এসব ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাতভর আতঙ্ক বিরাজ করে। অনেক এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি।


ছায়ানট 
 হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর শাহবাগসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে হামলার খবরের মধ্যে, একদল বিক্ষোভকারী রাত ১টার পর জড়ো হতে থাকেন ধানমন্ডির শংকরে ছায়ানট ভবনের সামনে। বাঙালিকে আপন সংস্কৃতি ও দেশীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাধীনসত্তায় বিকশিত হতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট এর আগে প্রাণঘাতি হামলার মুখেও পড়েছে। পাকিস্তানি শাসকদের বাধা উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং তার সূত্র ধরে পরে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের জন্ম। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে এটি পরিচিতি পেয়েছে।

প্রশাসন সারা দেশে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। সহিংসতায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। জনগণকে গুজবে কান না দেওয়ার এবং শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে দেশের অর্থনীতি, গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং বাংলাদেশ একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে পরিনত হতে পারে।