বিজয় দিবস উপলক্ষে বিশেষ রম্য কলিকালের কলধ্বণি-৪৭ ।। একটি বাস্তবসম্মত কাল্পনিক উপাখ্যান: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
কলিকালের কলধ্বনি - ৪৭
"একটি বাস্তবসম্মত কাল্পনিক উপাখ্যান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ"
একটি রম্য কলাম

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে নেতা বা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর দলের প্রধান হন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পছন্দে কয়েকজন মন্ত্রী নির্বাচিত হন। সংসদীয় গনতান্ত্রিক সিস্টেমে এটাই স্বাভাবিক চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় যারা মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁদের আচরণ বা কথাবার্তা শুনলে এবং কার্যক্রম দেখে জনগণ পরে হতাশ হয়। স্বাধীনতার পর থেকেই প্রায় সবার প্রতি জনগণ বিশ্রদ্ধ হয়েছে শেষ পর্যন্ত।
তাহলে কিভাবে এই হতাশাজনক অবস্থা থেকে বের হওয়া যায়? ধাপে ধাপে এক বাস্তবসম্মত, তাই আমরা আজকে এই বিশেষ আনন্দের দিনে একটি কাল্পনিক রম্য সমাধান দিচ্ছি। আমরা এখানে বেশ কয়েকটি ধাপে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছি বিচিত্র এক কাল্পনিক স্টাইলে। আমরা কতকগুলো ধাপে ধাপে এদের নিযোগ প্রক্রিয়া তুলে ধরছি।
প্রথম ধাপ: প্রাথমিক নির্বাচনী পরীক্ষা
ধরা যাক, সংসদ নির্বাচনের পর বাধ্যতামূলক দলের প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেয়া যাবে না। এখানে দলের প্রধানসহ আরও চারজনকে মনোনীত করবেন সব এমপি মিলে। এমপিরা গোপন ভোট দেবেন। আর দেশের সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী—সবার চোখ থাকবে যেন কেউ চকলেট খাচ্ছে না বা মোবাইলে ফেইসবুক দেখছে না। তার মানে হচ্ছে এরা গার্ড দেবেন। এরপর আসবে দ্বিতীয় ধাপ।
দ্বিতীয় ধাপ: লিখিত পরীক্ষা
প্রাথমিক নির্বাচিত প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন। ২০০ নম্বরের প্রশ্নপত্র, সময় চার ঘণ্টা। পরীক্ষার হলে লটারি করে দশজন গার্ড বসানো হবে। তাদের কাজ শুধু নজরদারি নয়—যখন প্রার্থী বারবার ওয়াশরুমে যায়, তখন মনে হবে, “এটা কি শারিরীক সমস্যা, না ধৈর্যের অভাব?” শরীরে অসুখ থাকলে আর ধৈর্য কম দেখলে এটাও মার্ক করবেন বিশিষ্ট পরীক্ষকবৃন্দ। এজন্য অন্তত লিখিত পরীক্ষা থেকে ১০ নম্বর কেটে রাখা হবে।
প্রশ্নগুলো বিসিএসের মতো কঠিন। বাংলাদেশে যত মন্ত্রনালয় আছে সব বিষয়ে প্রশ্ন থাকবে। এছাড়া রাজনীতি, তাঁর আগের অন্তত ৫০০ বছর আগের শাসকের প্রধানমন্ত্রী পদে যাঁরা পরীক্ষা দিতে বসবেন তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অবশ্যই হতে হবে যে কোন বিষয়ে কমপক্ষে মাসটার্স। তবে রাজনীীত বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে পাশ হলে অগ্রাধিকার থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় শতকরা ৮০% নম্বর পেলে পাশ। আর হ্যাঁ, কোনো প্রার্থী যদি পরীক্ষার কাগজে কলম ভুলে ফেলে, সেটা গার্ডরা হাসতে হাসতে নোট করে রাখবেন।
তৃতীয় ধাপ: ভাইবা পরীক্ষা
দ্বিতীয় ধাপের সেরা প্রার্থী ভাইবা পরীক্ষায় বসবেন। ভাইবা পরীক্ষা ৩০০ নম্বরের, বিসিএসকে লজ্জিত করে। শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা হবে—৬০–৮০ বছর বয়সেও কি দপ্তরে চা খাওয়ার সময় চেয়ার থেকে ঝাঁপ দিবেন না? আর হ্যাঁ, প্রার্থীর হাঁটাচলা, বসা—সব গার্ডদের চোখে থাকবে। এর ফলে পদে বসার পর যাতে ঘন ঘন বিদেশে গিয়ে চিকিতসা বাবত রাষ্ট্রের অনেক টাকা বাঁচবে। আবার তাঁর সাথে বিভিন্ন সময় ধরাধরি করে চলার জন্য অতিরিক্ত লোক রেখে জেনগনের টাকাও খরচ হবে না।
চতুর্থ ধাপ: মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা
শারীরিক সক্ষমতা উত্তীর্ণ হলে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা হবে, প্রার্থী কি হঠাৎ হাসছে, রেগে যাচ্ছে, না কি “আমি রাজা নাকি?” ধরণের ভাব দেখাচ্ছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এখানে থাকবেন, আর দেশি পরীক্ষকরা হেসে ফেলে ছোট ছোট ব্যঙ্গমিশ্রিত মন্তব্য করবেন। তখন তিনি রেগে যান কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। এ ধরনের পরীক্ষায় পাশ করে পদে বসলে, কোন মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী,-‘দেশে এত সন্ত্রাস হচ্ছে কেন‘-এ জাতীয় প্রশ্ন করলে, ‘দেশে পেয়াজের বাজার খুব সস্তা‘- এ জাতীয় উল্টাপালটা উত্তর দেবেন না। অথবা কোন মাকে স্বান্তনা দিতে গিয়ে বলবেন না, ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে‘ অথবা ইউ আর লুকিং ফর শত্রুজ‘ অথবা ‘আমি পালাবো না, দরকার হলে..“। কাউকে খোঁচা দিয়ে বা খোটা দিয়ে কথা বলার অভ্যাস থাকলে তিনি ফেল। পদে গেলে সবাই তাকে মিস্টার অমুক বলে নাম ধরে ডাকবে-এতে কি তিনি রাগ করবেন-এ প্রশ্ন করা হবে। সব কথায় ‘আমি‘ না আমরা শব্দ ব্যবহার করেন সেটাও পরীক্ষকরা বিচার করবেন কথা বলার সময়। পরীক্ষার নম্বর থাকবে ২০০। পাশ নম্বর হবে শতকরা ৯৫। কারণ মাথা ঠিক না থাকলে এত বড় পদে তো বারোটা বাজিয়ে দেবেন তিনি।
পঞ্চম ধাপ: নৈতিকতা পরীক্ষা
এবার নৈতিকতা পরীক্ষা। অতীতে প্রার্থী দূর্নীতি বা অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন কি না, সব খতিয়ে দেখা হবে। পাশের মান: ৯৫%। বোঝা যাচ্ছে—“আপনি কি সত্যিই ভালো মানুষ, নাকি হঠাৎ সব সুবিধা নিতে পছন্দ করেন?” দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ পরীক্ষকের সাথে এ পরীক্ষায় আরও কিছু মানুষ উপস্থিত থাকবেন। যেমন প্রার্থীর একেবারে ক্লাশ ওয়ান থেকে শুরু করে এম এ পর্যন্ত একসাথে পড়েছে এমন অন্তত তিনজন ঘনিষ্ঠ সহপাঠী। কারণ এরা তাঁর আসল নৈতিক চরিত্র জানে। তবে এরা প্রথমেই নিজ নিজ ধর্ম গ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ করে বলবে যে, তারা ‘সত্য‘ বলছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর চেনাজানা অন্তত তিনজন অতি দরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পাড়া প্রতিবেশীকে তাঁর আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নিজে কোনদিন লোভে পড়ে কারো সম্পত্তি বা টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছেন কি না এসব যাচাই করা হবে। সাধারণ মানুষ হিসাবে পৃথিবীর কতটি দেশ নিজের টাকায় ভ্রমণ করেছেন তাও জানতে চাওয়া হবে। যে যত বেশী দেশ ভ্রমণ করেছেন তার নাম্বার তত বেশী হবে। যার সম্পদ যত কম তাকে বেশী নম্বর দেয়া হবে। নম্বর থাকবে ২০০। শতকরা ৯৫% পেতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপ: অর্থনৈতিক পরীক্ষা
এবার আসল ঝামেলা—অর্থনৈতিক পরীক্ষা। প্রার্থী এবং তাদের নিকটতমদের সব সম্পদের হিসাব দিতে হবে। কিভাবে অর্জিত হয়েছে, তা প্রমাণসহ বোর্ডের সামনে বলতে হবে। বোঝা যাচ্ছে, যদি লকারে লুকানো সোনা থাকে, সেটা ধরা পড়বে। এমনকি তাঁর বাপ-দাদার আগের সম্পত্তির পরিমান ও বিনিময় মূল্য কত সেটাও বিচারকরা লিখে রাখবেন যাতে পাশ করে পদে বসলে পরে উঠানামা বোঝা যায়। পদে বসে তিনি কোন ব্যবসা বা লাভজনক কাজের কোন মালিকানায় থাকতে পারবেন না। নম্বর থাকবে ২০০। শতকরা ৯৫% পেতে হবে।
সপ্তম ধাপ: ভাষাগত পরীক্ষা
শেষ ধাপে ভাষাগত পরীক্ষা। প্রার্থীকে ইংরেজী, বাংলা এবং অন্য একটি প্রচলিত ভাষায় লিখিত, মৌখিক ও উচ্চারণ পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ বিদেশ গেলে অনেকেই এই পদে বসে, বিদেশীদের সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। বোর্ডে থাকবেন পৃথিবীর বিখ্যাত ভাষাবিদরা, দেশি পরীক্ষকরা, আর কেউ কেউ হেসে ফেলে ছোট ছোট উচ্চারণ ধরার জন্য। নম্বর থাকবে ২০০। শতকরা ৯৫% পেতে হবে।
অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ ও বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা
একবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে, তিনি যেসব মন্ত্রী নিয়োগ দেবেন—যেমন স্বরাষ্ট্র, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদি—তাঁদেরও বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা দিতে হবে। এবং বাকীসব ধাপের পরক্ষায় অংশ নিতে হবে। এছাড়া প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য পৃথক পরীক্ষা হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পরীক্ষা হবে আইন, নিরাপত্তা, প্রশাসন নিয়ে; শিক্ষা মন্ত্রীর পরীক্ষা হবে শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম নিয়ে; পরিবেশ মন্ত্রীর পরীক্ষা হবে পরিবেশ বিজ্ঞান ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে।
প্রতিটি পরীক্ষায় ন্যূনতম ৮০–৯৯% নম্বর পেতে হবে। বোর্ডে থাকবে দেশের সেরা এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ মন্ত্রী হওয়া মানে—ঠিকমতো পড়াশোনা, যোগ্যতা এবং সততার সমস্ত পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হবে। তিনি ডাক্তার, ব্যারিস্টার যে পেশায় থাকুন না কেন তাঁকে অবশ্যই
যে কোন বিষয়ে এম এ পাশ হতে হবে। তিনি মন্ত্রী হবার পর সব ব্যবসা ছাড়তে হবে।
কেন এভাবে কঠোর পরীক্ষা? কারণ ডাক্তার, শিক্ষক, উকিল, প্রশাসক, পুলিশ—সব পেশায় কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। তারপরও অদক্ষতা ধরা পড়ে।
মাঠে কয়েক বছরের বক্তৃতাবাজি, মানুষকে ভুল বোঝানো, আর “গাই এর বাছুর এ গাই এর সাথে” মেলানো—এতে কারো মাতবর হওয়া বেমানান। মন্ত্রী হয়ে দেশের সেরা শিক্ষিত মানুষদের উপর ছড়ি ঘোরানো যাবে না।
কারণ স্বাধীনতার পর থেকেই দেখেছি, কিছু মন্ত্রী বা এমপি এমন বালখিল্য কথাও বলেন যা হাস্যকর। আবার কেউ কেউ এমন অনৈতিক কাজ করেন যা অত্যন্ত ঘৃণ্য।
সুতরাং, শুদ্ধ ও নৈতিক শাসক পেতে হলে দেশের জনগণকে এই ছয়–সাত ধাপ এবং মন্ত্রীদের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা সহ ফর্মুলা অনুসরণ করতে হবে। আর কোনো বিকল্প নেই!