ইরান আসলে কোনটা—কূটনীতি, না শক্তি?
লন্ডন, ২১ এপ্রিল:
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আবারও এক অস্থির দোলাচলে ঢুকে পড়েছে, যেখানে একদিকে কূটনীতি, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনা—দুই-ই সমান তালে চলেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যেন একটি পুরনো নাটকের নতুন সংস্করণ, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য বদলাচ্ছে দ্রুত, আর প্রতিটি ঘোষণাই তৈরি করছে নতুন বিভ্রান্তি।
গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালী আবার নৌযান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু এই ‘খোলার’ ঘোষণার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল গভীর মতভেদ।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু গণমাধ্যম দ্রুতই আরাগচির অবস্থানের সমালোচনা করে জানায়, তিনি নাকি প্রণালী খোলার শর্ত বা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরেননি। অর্থাৎ, একদিকে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক ভাষ্য, অন্যদিকে সামরিক-রাজনৈতিক শক্তির ভিন্ন বার্তা—ইরানের ভেতরকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আবারও সামনে চলে আসে।
এরপরই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। পরদিনই এক সামরিক মুখপাত্র দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী আবার কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ওঠে, কয়েকটি জাহাজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়—এটি শুধু একটি কূটনৈতিক ইস্যু নয়, বরং মাঠপর্যায়ের সামরিক উত্তেজনারও প্রতিফলন।
এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও কম নাটকীয় ছিল না। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধের কারণেই ইরানি জাহাজের জন্য প্রণালী কার্যত আগেই বন্ধ হয়ে আছে। অর্থাৎ, তিনি ইরানের ঘোষণাকে প্রতীকী বা অকার্যকর বলে উপস্থাপন করেন এবং সরাসরি সামরিক শক্তির অবস্থানকে সামনে আনেন।
এর মাঝেই আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য আসে—২০ এপ্রিল ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী একটি ইরানি কার্গো জাহাজে অভিযান চালিয়েছে এবং সেটিকে আটক করেছে। এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। কারণ একই সময় তিনি আবারও ইঙ্গিত দেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে নতুন আলোচনার জন্য মার্কিন প্রতিনিধিদল পাঠানো হতে পারে।
এই দ্বিমুখী অবস্থান—একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে সামরিক হুমকি—মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিচ্ছেন, যদি আলোচনায় অগ্রগতি না হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আসলে ওয়াশিংটন কোন কৌশলে এগোচ্ছে—চাপ প্রয়োগ করে সমঝোতা, নাকি সরাসরি সংঘাতের দিকে ধাবিত হওয়া?
বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো পরিস্থিতির মূল জটিলতা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিহিত। একদিকে দেশটির নির্বাচিত সরকার ও কূটনৈতিক মহল আন্তর্জাতিক চাপ কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাইছে, অন্যদিকে বিপ্লবী গার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী। ফলে একই রাষ্ট্র থেকে আসছে পরস্পরবিরোধী বার্তা, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে আরও অস্পষ্ট করে তুলছে।
এই বিভাজন শুধু নীতিগত নয়, বরং কৌশলগতও। কারণ ইরানের ভেতরে কে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে—সরকার, নাকি সামরিক-নিরাপত্তা কাঠামো—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। আর এই অনিশ্চয়তাই যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তিকে তাদের অবস্থান বারবার পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুধুই একটি সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নয়। এটি আসলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল, এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার এক জটিল ত্রিভুজীয় সংঘাতের প্রতিফলন।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দ্বন্দ্বের ভেতর কোন ইরানের সঙ্গে আসলে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলছে? কূটনীতির ইরান, নাকি সামরিক শক্তির ইরান? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আগামী দিনের যুদ্ধ না শান্তির পথ।