কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬১।। সাংবাদিকতা কি এখনও জ্ঞাননির্ভর পেশা?
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬১।।
সাংবাদিকতা কি এখনও জ্ঞাননির্ভর পেশা?
উৎসর্গ
বিশ্বের তাবৎ শুদ্ধ সাংবাদিকের প্রতি
সাংবাদিকতা কোনো তাৎক্ষণিক পরিচয় নয়, এটি একটি দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। তবুও বর্তমান বাস্তবতায় “সাংবাদিক” শব্দটি যত বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তার পেশাগত মান ও অর্থ ততটাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সমস্যা মানুষের অভাবে নয়, সমস্যা মানদণ্ডের অবক্ষয়ে। প্রশ্ন উঠছে—সাংবাদিকতা কি এখনও জ্ঞাননির্ভর পেশা, নাকি তা ক্রমে দৃশ্যমানতা ও পরিচয়ের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে? আজকাল দেশে বিদেশে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও অনেকে সাংবাদিকতার মতো একটা অতি জ্ঞানভিত্তিক পেশায় কিছু সময় ব্যস্ত রেখে, অথবা না রেখেই সর্বত্র নিজেদের সাংবাদিক হিসাবে তুলে ধরছেন। আবার ইউটিউব বা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের রিপোর্টারদের মুখে ইদানিং প্রতিটি কথায় ‘কিন্তু‘ কিন্তু’ শব্দটি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। এমনও দেখেছি, ভাল করে একটা নিউজ বা একটি কলাম বা ফিচার বা নিবন্ধ লিখতে যারা হিমশিম খায় তারাও নিজেদের সাংবাদিক হিসাবে তুলে ধরতে জীবন বাজী রেখে লড়ে যাচ্ছেন জীবনের নানা আঙিনায়।
তাই এখন প্রশ্ন জাগে, সাংবাদিকা আসলে কি?
ইউনেস্কো সাংবাদিকতাকে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন একটি পেশা হিসেবে, যেখানে জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ ও দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়।
Oxford Research Encyclopedia of Journalism Studies সাংবাদিকতাকে বলছে institutionalized truth-seeking practice—অর্থাৎ এটি ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং কাঠামোবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক সত্য অনুসন্ধান।
এই কাঠামো দুর্বল হয়ে গেলে সাংবাদিকতা আর পেশা থাকে না, কেবল উপস্থিতিমাত্রে পরিণত হয়।
অধ্যয়ন ও গবেষণা: অবহেলিত ভিত্তি
গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে—একজন দক্ষ সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি। Pew Research Center দেখিয়েছে, পাঠাভ্যাস ও গবেষণার ঘাটতির কারণে অনেক সংবাদ ক্রমশ surface-level reporting-এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আসলে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এসব বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা ছাড়া কোনো ঘটনাকে তার পূর্ণ প্রেক্ষাপটে বোঝা সম্ভবই নয়।
Bill Kovach ও Tom Rosenstiel তাঁদের বহুল উদ্ধৃত গ্রন্থে লিখেছেন, সাংবাদিকতা মূলত verification-এর একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রক্রিয়া। মতামত প্রকাশ নয়, যাচাইই এর কেন্দ্রবিন্দু। অতচ আজকাল অনেক সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিয়মিত পড়াশোনার দিকে ঝোঁকই নেই। বিশ/ত্রিশ বছর আগে যে দু‘চারটি পাশ দিয়েছিল এটাই ভেঙে খাচ্ছে এতবছর পরও। অনেকে বাড়িঘরে গেলে দেখা যায়, দশ/বিশটা পড়ার মতো বই-ই নেই নিজের ভান্ডারে। এসব মানদণ্ডে বিচার করলে প্রকৃত সাংবাদিক যে সর্বত্র হাতে গোনা—তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
দক্ষতা বনাম দৃশ্যমানতা
ডিজিটাল যুগে দৃশ্যমানতা অনেক সময় দক্ষতার বিকল্প হিসেবে হাজির হয়েছে। Reuters Institute for the Study of Journalism (Oxford University) তাদের Digital News Report-এ দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি বাড়লেও বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতার গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে কমছে।
ফলে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সংবাদ লেখার কাঠামো, সূত্র যাচাই বা প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে উপস্থিতি ও প্রবেশাধিকার। অনেকেই নিয়মিত প্রশ্ন করেন, মন্তব্য দেন—কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ বা বিশ্লেষণ লিখতে গেলে অসুবিধায় পড়েন। লিড, ব্যাকগ্রাউন্ড বা attribution-এর মতো মৌলিক ধারণাগুলো অনেক সময় তাত্ত্বিক জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকে।
প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার সান্নিধ্য
Columbia Journalism Review দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, সাংবাদিকতার একটি বড় ঝুঁকি হলো ক্ষমতার অতিরিক্ত নিকটতা। যখন পেশাগত দক্ষতার চেয়ে পরিচিতি ও অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সাংবাদিকতার ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এই প্রক্রিয়ায় এমন এক শ্রেণির উত্থান ঘটে, যারা সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব দাবি করেন, যদিও তাদের পেশাগত অবদান সীমিত। আজকাল তো দেশে-বিদেশে সবখানেই যারা অঢেল অর্থের মালিক তাঁরাই সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মালিক। আবার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ না করে অন্যান্য টেকনিক্যাল কাজ করে তারাও দেখছি নিজেকে সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দেন। অনেকে আবার ইদানিং ইউটিউব খুলে নানা প্যাঁচাল পেড়ে সাংবাদিক বনতে চান। নাম আর ভিউয়ের আশায় আজকাল অনেকেই এসব কান্ড করে যাচ্ছেন অহরহ। অন্যদিকে যারা নিয়মিত পড়েন, গবেষণা করেন, লেখেন—তাঁরা অনেক সময় নীরবেই থেকে যান। আসলে যে জানে, আর যে জানে না সে তো কখনোই এক হতে পারে না।
সাংবাদিকতায় ভেজাল ঢোকার বাস্তবতা
এই ব্যবধান থেকেই সাংবাদিকতায় ধীরে ধীরে ভেজাল ঢুকে পড়ে। আজকাল ফেইসবুকে উল্টাপাল্টা লিখেও অনেকে নিজেদের সাংবাদিক দাবি করে বসেন। কিন্তু ফেইসবুকের তথ্য তো অবশ্যই যাচাই বাছাই ছাড়া যে কেউ লিখতে পারেন।
Poynter Institute-এর গবেষণা বলছে, যাচাইহীন তথ্য, অস্পষ্ট সূত্র ও প্রেক্ষাপটহীন উপস্থাপন সাংবাদিকতার প্রতি জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
Society of Professional Journalists (SPJ) যেখানে accuracy, accountability এবং minimizing harm-কে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে, সেখানে বাস্তবে এই নীতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে কেবল নীতিমালাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বিভ্রান্তির জায়গা
এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে—কে প্রকৃত সাংবাদিক, আর কে কেবল সাংবাদিক পরিচয়ে অভ্যস্ত। কে জনস্বার্থে প্রশ্ন করছেন, আর কে প্রশ্নকে ব্যবহার করছেন ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে—এই সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যাজ নয়, এটি একটি দায়িত্বশীল জ্ঞানচর্চা। পড়া, গবেষণা, যাচাই ও নৈতিকতা—এই চারটি স্তম্ভ ছাড়া সাংবাদিকতা টেকসই হতে পারে না।
আজ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকট হলো সংখ্যার আধিক্য নয়, বরং মানসম্পন্ন সাংবাদিকের ঘাটতি।
এই প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে—সাংবাদিকতা কি এখনও জ্ঞাননির্ভর পেশা—এর উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিনই থেকে যাবে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
গবেষণা ও রেফারেন্স
-
Bill Kovach & Tom Rosenstiel, The Elements of Journalism
-
UNESCO, Journalism, ‘Fake News’ & Disinformation Handbook
-
Reuters Institute for the Study of Journalism, Digital News Report
-
Pew Research Center, State of the News Media
-
Society of Professional Journalists (SPJ), Code of Ethics
-
Poynter Institute, Journalism Ethics and Verification
-
Columbia Journalism Review, Power, Access and Accountability in Journalism
-
Oxford Research Encyclopedia of Journalism Studies