ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
জলবায়ু সংকটে ইউরোপে ইতিহাসের ভয়াবহতম গরম: জনজীবনের অবস্থা চরম
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৬ জুন:
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিস্তৃতগুলোর একটি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবলমাত্র জলবায়ু সংকট—বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন—এর কারণেই সম্ভব হয়েছে।
একটি নতুন বিশ্লেষণে World Weather Attribution consortium-এর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পশ্চিম ইউরোপজুড়ে বর্তমান হিটওয়েভটি এতটাই চরম যে, প্রাকৃতিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের মতে, “এই মাত্রার তাপপ্রবাহ জুন মাসে জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া সম্ভবই হতো না।”
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় ৮৫০টি বড় শহরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শহর তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ “হিট স্ট্রেস” বা তাপ-আর্দ্রতার চাপের মধ্যে রয়েছে। আর্দ্রতার কারণে ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে পারে না এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।

বুধবার যুক্তরাজ্যে চলতি জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সামারসেট এলাকায় মাপা হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই সময়ে চিকিৎসা জরুরি সেবার চাপ বেড়ে যায়, বহু জায়গায় স্কুল বন্ধ, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপ এবং ট্রেন ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ইউরোপীয় গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবারের পরিস্থিতির পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি এখনো নিরূপণ করা হয়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর প্রভাবও অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।
Imperial College London-এর গবেষক ড. থিওডর কিপিং জানান, গত ৫০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার ফলে এমন তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ২০০৩ সালের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি প্রায় ২ ডিগ্রি বেশি উষ্ণ, আর ১৯৭৬ সালের তুলনায় প্রায় ৩.৫ ডিগ্রি বেশি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে রাতের বেলায় অতিরিক্ত গরমের কারণে ঘুম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ২০০৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের গ্রীষ্মকালগুলো আরও চরম হতে পারে।
এখন ইউরোপের প্রায় ১০ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাপ ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবে শহরগুলোর জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু সংকটের এই তীব্রতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান Simon Stiell। তিনি বলেন, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ওপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরতা এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করছে। তবে তার মতে, সমাধানও স্পষ্ট—দ্রুত গতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং বন সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি।
অন্যদিকে Red Cross Red Crescent Climate Centre জানিয়েছে, ২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পর ইউরোপের অনেক দেশ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করলেও তা এখনো যথেষ্ট নয়। সংস্থাটির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু অভিযোজন নীতিগুলো আরও জোরদার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের এই তাপপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়—এটি জলবায়ু সংকটের বাস্তব ও ত্বরান্বিত প্রভাব, যা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ আকারে দেখা দিতে পারে।