পাঠকের কলাম
মৃত্যু এবং মৃত্যুদণ্ড ।। গোলাম কবির
মৃত্যু এবং মৃত্যুদণ্ড
।। গোলাম কবির ।।

মৃত্যু মানেই শেষ। দ্য এন্ড! সেই দৃষ্টিকোণ থেকে একজন মানুষের মৃত্যুমুহূর্ত থেকে তিনি আর কিছুতেই নেই। অপরাধেও নেই, কল্যাণের কাজেও নেই।
সুতরাং অপরাধীকে তার অপরাধের শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলা মানেই তাকে তার কৃত অপরাধের বোধ নিয়ে বেঁচে থাকার শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া!
শাস্তি নিয়ে বেঁচে থাকলে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর হয়। কারাগারে সীমাবদ্ধ নিয়মের মধ্যে সশ্রম শাস্তিই সেজন্য উপযুক্ত বলে আমার কাছে মনে হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যুর সংজ্ঞা যাই হোক, প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর মুহূর্তেই একজন ব্যক্তি তার পার্থিব সম্পর্ক থেকে সমাপ্ত হয়ে যান। সেদিক থেকে মৃত্যুর পর শান্তি কামনা, স্বর্গে যেন যেতে পারেন সেই কামনা, কিংবা তেমন ব্যক্তির শত্রুপক্ষের দিক থেকে তার নরকে যাওয়ার কামনা (অভিশাপ) কোনোটাই যৌক্তিক নয়।
কেউ যদি বলেন যে- আর পারছি না, মৃত্যু হলেই বেঁচে যাই, তাহলে সেটাও অযৌক্তিক।
কারণ মৃত্যুর পর তার তো আর কোনো ভালো-মন্দই থাকছে না!
তবে হ্যাঁ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য যত তাড়াতাড়ি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, ততই তার কল্যাণ! যদিও তার আপনজনদের জন্য শাস্তির শুরু! ইত্যাদি বিবেচনায় গুরুতর অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়াই শ্রেয় নয় কি! উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধী সোহেল রানা এবং তার স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার উল্লেখ করা যেতে পারে।
কী মর্মান্তিক, পৈশাচিক, অমানবিক, ঘৃণ্য অপরাধ তাদের! অথচ আইনি প্রক্রিয়া ইত্যাদি কারণে ৩ মাস পর হলেও তাদের মৃত্যু হতে চলেছে। অর্থাৎ তাদের শাস্তির সমাপ্তি হতে চলেছে!
মৃত্যুদণ্ড অমানবিকও বটে। তাজা টাটকা একটি মানুষকে কয়েকজন মানুষের চোখের সামনে একজন মানুষ (জল্লাদ) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ঘাড়ে কোপ মেরে (আরব ইত্যাদি দেশে) হত্যা করেন! মানব সমাজে এই হত্যাও নির্মম। মানুষ নিজেদের ক্ষুধানিবৃত্তি নিবারণে হাঁস, মুরগি, পাখি, গরু, ছাগল, ভেড়া, উট ইত্যাদির গলা কেটে জবাই করা (পশু হত্যা) প্রথাটিও অমানবিক। এমনকি তাজা জ্যান্ত মাছ বটি দিয়ে কাটাও অমানবিক!
প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যু আর হত্যায় অনেক তারতম্য আছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম এবং মৃত্যু পর্যন্ত সময় অবধি বেঁচে থাকার অধিকার আছে সকল প্রাণীর। ধর্মগুলোও সেই অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছে। যেহেতু মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই প্রাণীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মগজধারী, তাই মানুষেরই দায়িত্ব প্রাণীকুলের এই অধিকার সংরক্ষণ। এক্ষেত্রে মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্যও প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত।
সুতরাং মানব সভ্যতায় মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে সঠিকভাবে ভেবে দেখা উচিত।
শাস্তি বিষয়ে মানবিক চিন্তা থাকা আবশ্যক। প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিশেষ করে মাদ্রাসা বা মক্তবগুলোতে শিক্ষার্থী শিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের শাসনে আমাদের দেশে উল্লেখিত মানবতা লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে নেক্কারজনকভাবে। সামাজিক এবং সরকারি বিধানে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অনিবার্য।
গোলাম কবির: নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
লন্ডন
২৬ জুন ২০২৬