ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১২ ।। একজন বলে জঙ্গি আছে, আরেকজন বলে তৎপরতা নাই : জনগণ এখন কোথায় যাই?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১২ ।।  একজন বলে জঙ্গি আছে, আরেকজন বলে তৎপরতা নাই : জনগণ এখন কোথায় যাই?

 উৎসর্গ

সাধারণ মানুষদের, যারা প্রতিদিন রাষ্ট্রের দুই রকম কথার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের নিরাপত্তা নিজেই অনুমান করতে বাধ্য হন”

দেশের ভেতরেই যেন এখন দুই রাষ্ট্র। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলছেন—দেশে জঙ্গি আছে, তবে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলছেন—দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। একই দিনে, একই সরকারের দুই ভিন্ন সুর। ফলে প্রশ্নটা আর শুধু রাজনৈতিক নয়—এটা এখন সরাসরি জনগণের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রশ্ন।

এই দ্বৈত বক্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরও কিছু বাস্তবতা, যা অস্বস্তিকর হলেও অস্বীকার করা যায় না। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় হযরত শাহজালালসহ সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে। আবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন—“কোনো নির্দিষ্ট হুমকি নেই, এটি নিয়মিত সতর্কতার অংশ।”

এখানেই দ্বন্দ্বের আসল চিত্র—
হুমকি নেই, কিন্তু সতর্কতা আছে।
জঙ্গি তৎপরতা নেই, কিন্তু নিরাপত্তা জোরদার।

এ যেন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে শব্দগুলো বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

এর সঙ্গে যোগ হয় আরও ভয়ংকর পরিসংখ্যান—গোয়েন্দা তালিকায় থাকা ১৬১১ জন জঙ্গির সক্রিয় থাকার তথ্য, শত শত জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়া, বহু অভিযুক্তের গ্রেপ্তার না হওয়া। তাহলে প্রশ্নটা আবারও ফিরে আসে—তৎপরতা না থাকলে এই প্রস্তুতি কেন? আর এভাবে চলতে থাকলে আমরা যারা বিলাত, আমেরিকা বা বিভিন্ন দেশে বসবাস করছি, তাঁরা কিভাবে দেশে যেতে আগ্রহী হবো?

এই জায়গায় এসে ইতিহাস আমাদের সামনে এক কঠিন আয়না তুলে ধরে।
জঙ্গিবাদ হঠাৎ করে জন্ম নেয় না—এর পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

আফগানিস্তানের ইতিহাস তার বড় উদাহরণ। ১৯৭৮ সালে পিডিপিএ ক্ষমতায় এসে দমন-পীড়নের রাজনীতি শুরু করে। এরপর সোভিয়েত হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক বিরোধিতা, এবং মার্কিন-পাকিস্তানি মদদে “মুজাহিদীন” তৈরি—সব মিলিয়ে এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়, যা পরে বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদের বীজ বপন করে। সেই মুজাহিদীনদের মধ্যেই ছিলেন ওসামা বিন লাদেনের মতো ব্যক্তিরা, যারা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের ভিত্তি গড়ে তোলেন।

এই প্রভাব বাংলাদেশেও এসে পৌঁছায়। আফগান ফেরত যোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে গড়ে তোলে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ। ১৯৯৯ সালে যশোর উদীচী বোমা হামলা, ২০০১ সালের রমনা বটমূলে হামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা—এসব ঘটনা প্রমাণ করে, জঙ্গিবাদ কখনোই “কল্পনা” ছিল না; এটি ছিল বাস্তব, এবং ভয়াবহ।

আরেকদিকে আরাকান বা রোহিঙ্গা ইস্যুকে ঘিরেও একটি জটিল জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণ, বিদেশি অর্থায়ন, এবং বিভিন্ন সংগঠনের সম্পৃক্ততা—এসব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়, যার প্রভাব বহু বছর ধরে দেশের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছে।

এই ইতিহাসের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—
জঙ্গিবাদ কখনো হঠাৎ করে “নেই” হয়ে যায় না।
এটি কখনো সুপ্ত থাকে, কখনো গুপ্ত থাকে, কখনো সক্রিয় হয়, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়—এমনটা খুব কমই ঘটে।

তাই যখন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন “জঙ্গি আছে”, এবং আরেকজন বলেন “তৎপরতা নেই”—তখন সমস্যাটা শুধু বক্তব্যের পার্থক্য নয়, সমস্যাটা হলো বাস্তবতা বোঝার ভিন্নতা।

রাষ্ট্র যদি সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে না পারে, তাহলে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। আর বিভ্রান্ত জনগণ কখনোই নিরাপদ বোধ করে না।

কারণ মানুষ ভয়কে মেনে নিতে পারে,
কিন্তু অনিশ্চয়তাকে মেনে নিতে পারে না।

আজকের বাস্তবতা সেই অনিশ্চয়তারই প্রতিচ্ছবি—
নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে, কিন্তু বলা হচ্ছে হুমকি নেই।
জঙ্গি থাকার কথা বলা হচ্ছে, আবার বলা হচ্ছে তৎপরতা নেই।

তাই জনগণের প্রশ্নটা এখন আরও গভীর—
আমরা কি বাস্তবতার মধ্যে আছি, নাকি বক্তব্যের মধ্যে?

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস।
আর সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, যখন একই দিনে দুই রকম সত্য শোনা যায়।

তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি বিষয়—
জঙ্গি আছে কি নেই, তার চেয়েও বড়—
রাষ্ট্র কি এক ভাষায় কথা বলতে পারবে?

কারণ জনগণ এখনো অপেক্ষা করছে—
একটি স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য, এবং একক সত্যের জন্য।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন ২৯ এপ্রিল, ২০২৬