নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫ ।। নাটোরের জার্মান বাড়ি
উৎসর্গ
বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় পৃথিবীর সব জার্মান সমর্থকদের
।। নাটোরের জার্মান বাড়ি ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

“নাটোরের জার্মান বাড়ি”
বাংলাদেশের নাটোর জেলা বড়াইগ্রামের বনপাড়া পৌর শহরের কালিকাপুর মহল্লা ।
বিশ্বকাপ ফুটবল খেলারে শুরু থেকেই এখানে আজকাল একটা বাড়িকে ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগে থাকে। দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসে। কেউ আসে পরিবার নিয়ে, কেউ আসে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে নীরবে।
কারণ, এটা কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। এটা এখন মানুষের চোখে “জার্মান বাড়ি”।
বাড়ির মালিক সাগর কুলেন্তুনু। বয়স ৩৬। তিনি এখন জার্মানির ডর্ডমুন্ডে একটি হাসপাতালে নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তার শিকড় এই মাটিতেই, এই কালিকাপুরেই।
এক সময় এই বাড়িটা ছিল সাধারণ মাটির উঠোন, সবুজ গাছপালা আর টিনের চালের একটা গ্রাম্য জীবন। এখন সেই উঠোন বদলে গেছে এক অন্যরকম দৃশ্যে।
একজন পথচারী দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,
“এটা কি কোনো বাড়ি, নাকি ফুটবল স্টেডিয়াম?”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হাসে,
“না, এটা একটা ভালোবাসার গল্প।”
বিকেলের হালকা রোদে বাড়ির ভেতরটা ঝলমল করছে।
এক একর জায়গাজুড়ে সাজানো হয়েছে ফুটবল মাঠের আদলে। মাঝখানে বিশ্বকাপের প্রতিকৃতি। তার চারপাশে জার্মান জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের প্রতিকৃতি। গোলপোস্টও আছে। যেন সত্যিকারের ম্যাচ চলছে, কিন্তু দর্শক নেই শুধু স্মৃতিরা।
দেয়াল, টিনের চাল, এমনকি দুই শতাধিক গাছও রং করা হয়েছে জার্মানির কালো-লাল-হলুদ রঙে।
বাতাসে দোল খাচ্ছে চল্লিশটি জার্মান পতাকা।
আর একটু উঁচুতে, আলাদা করে রাখা দশটি বাংলাদেশের পতাকা। স্থানীয়রা বলে, এগুলো এক ফুট উঁচু করে রাখা হয়েছে নিজের দেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে।
এক তরুণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে বলে,
“এটা শুধু সাজ না। এটা একটা ঘোষণা।”
ঠিক তখনই সাগরের মা কানন গমেজ ধীরে বলেন,
“আমার ছেলে বিদেশে থাকে। কিন্তু মনটা এখানে পড়ে থাকে। সে ভিডিও কলে সব ঠিক করে দিয়েছে।”
তিনি একটু থেমে আবার বলেন,
“মানুষ আসছে, দেখছে, খুশি হচ্ছে। আমারও ভালো লাগছে।”
সাগরের জীবন সহজ ছিল না।
ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে পড়াশোনা, পরে চকরিয়ায় প্যাথলজি ডিপ্লোমা, আবার স্নাতক। বাবার চাকরি ছিল ঢাকার আমেরিকান ক্লাবে। ২০১৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর জীবন আরও বদলে যায়। বড় ভাই বাহরাইন যায়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় প্রবাস জীবনের নতুন অধ্যায়। বাহরাইন, তারপর জার্মানি। নার্সিং পড়াশোনা, ভাষা শেখা, হাসপাতালের কাজ—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রা।
আজ তিনি ডর্ডমুন্ডের হাসপাতালে ইনস্ট্রাক্টর।
কিন্তু মনটা যেন থেমে আছে এই কালিকাপুরেই।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতেই তিনি আবার বাড়িটাকে সাজাতে বলেন। বাড়ির দেয়াল ও টিনের চাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির ২ শতাধিক গাছ রং করা হয়েছে জার্মান পতাকার কালো-লাল-হলুদ রংয়ে।
ভিডিও কলে তিনি নির্দেশ দেন,
“এই গাছটা লাল-হলুদ করো। ওই দেয়ালে পতাকা লাগাও।”
কানন গমেজ হাসতে হাসতে বলেন,
“ও দূরে থেকেও সব দেখে।”
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিয়ের সময়ও এই বাড়ি নতুন রূপ নেয়। যশোরের মেয়ে এমলিনা সরকার যখন এই বাড়িতে আসেন, তখন পুরো আঙিনা জার্মানির রঙে রঙিন ছিল। অতিথিরা বিস্মিত হয়েছিল।
আজও সেই বিস্ময় যেন ফিরে এসেছে।
স্থানীয় এক শিক্ষার্থী অরলীন ডি কস্তা বলে,
“আমি আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করি। কিন্তু এখানে এসে ছবি না তুলে পারলাম না।”
আরেকজন বলেন,
“এটা দল নয়, এটা শিল্প।”
মেয়র প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মেমন দূর থেকে তাকিয়ে বলেন,
“এটা এখন এলাকার পরিচিতি হয়ে গেছে। মানুষ আসছে, দেখছে, আলোচনা করছে।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে।
পতাকাগুলো অন্ধকারে হালকা দুলতে থাকে।
দূর থেকে কেউ প্রশ্ন করে,
“এই বাড়িটা কার জন্য?”
কেউ উত্তর দেয় না।
শুধু বাতাস বলে যায়—
এটা কি জার্মানির জন্য? না কি নিজের হারিয়ে যাওয়া শিকড়কে ধরে রাখার চেষ্টা?
আর সেই প্রশ্নটা ধীরে ধীরে আঙিনার ভেতর ছড়িয়ে যায়। জার্মান বাড়িটি দেখে মনে হয়-
‘কূলায় প্রত্যাশী পাখির চোখের মতো
মানুষ কেবল ভালোবাসে নিজ বাসভূমি,
তার নিজের স্বদেশভূমি ছাড়া
পৃথিবীতে আর কোন প্রিয়তম দেশ নেই,
নেই কোন আশ্রয়ের উদার মৃত্তিকা
এই বদ্বীপের সমুদ্রের সমতটে
আত্মার বন্দরে
চির জনমের মতো নোঙর ফেলে রেখেছে সে....
লন্ডন, ১৩ জুন ২০২৬
