কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩১ ।। সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের বাজেট: এক তুলনামূলক বিশ্লেষণ
উৎসর্গ
বাজেটের ফলে যাদের নাভিশ্বাস উঠে প্রতিবছর সেইসব ভুক্তভুগি জনতাকে
প্রতি বছ্র বাজেট নিয়ে আলোচনা প্রায়ই শুরু হয় সংখ্যা দিয়ে এবং শেষ হয় রাজনৈতিক বিতর্কে। সরকারী দল বলে ‘খুবই উন্নত বাজেট’ আর বিরোধী দল ও জনগন বলে ‘বাজেট মানেই জিনিয়ের দাম বাড়ানো’। কিন্তু মাঝখানে যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হারিয়ে যায়, তা হলো—একটি বাজেট আসলে কোন বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে? একটি দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন না বুঝে বাজেটের অঙ্ক তুলনা করলে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটের মাঝখানে যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হারিয়ে যায়, তা হলো—একটি বাজেট আসলে কোন বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে? একটি দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন না বুঝে বাজেটের অঙ্ক তুলনা করলে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ এবং বাংলাদেশের বাজেট তুলনা করলে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক সময় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা বলেন, তাঁরা বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর’ বানিয়ে ছাড়বেন। আসুন এবারে দেখা যাক সিঙ্গাপুর আর মালদ্বীপের মতো দুই দ্বীপ রাষ্ট্রের তুলনায় আমাদের বাজেটের অবস্থান কিভাবে আছে। এর ফলে বাজেট নিয়ে পাঠকদের একটা অন্য ধরনের ধারণাও জন্মাবে।

প্রথমে সিঙ্গাপুরের প্রসঙ্গ আসা যাক। সিঙ্গাপুর একটি নগর-রাষ্ট্র। এর আয়তন প্রায় ৭৩০ বর্গকিলোমিটার—একটি মাঝারি আকারের শহরের সমান। জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ এটি এমন একটি দেশ, যেটি একই সঙ্গে একটি শহর, একটি বন্দর এবং একটি বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র।
এই ছোট ভৌগোলিক পরিসর সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক শক্তি অসাধারণ। কারণ এটি জনসংখ্যার ভিত্তিতে নয়, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ফলে তাদের বাজেটও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন।
সিঙ্গাপুর সরকারের বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১০০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের মধ্যে থাকে। টাকায় রূপান্তর করলে এটি প্রায় ৮.৫ থেকে ১১ ট্রিলিয়ন টাকার সমান। এই বাজেট একটি উচ্চ আয়ভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি।
এখন মালদ্বীপের দিকে তাকানো যাক। মালদ্বীপ আয়তনে অত্যন্ত ছোট একটি দ্বীপরাষ্ট্র, প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ৫ থেকে ৬ লক্ষের মতো। সমুদ্রের উপর ছড়িয়ে থাকা শত শত দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটির অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর।
মালদ্বীপের বাজেট তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট—সাধারণত প্রায় ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। টাকায় এটি আনুমানিক ০.৫ থেকে ০.৭ ট্রিলিয়ন টাকার মতো। এই বাজেট একটি ক্ষুদ্র জনসংখ্যার রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হলেও এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।
এখন বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসি। বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার দেশ। আয়তন প্রায় ১,৪৭,০০০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এটি একটি বৃহৎ জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বহুমাত্রিক এবং জটিল।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রায় ৭.৯ ট্রিলিয়ন টাকা। এই বাজেটের আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একসাথে পরিচালিত হয়।
এই তিনটি দেশের বাজেট পাশাপাশি রাখলে চিত্রটি দাঁড়ায় এমন—
মালদ্বীপ: প্রায় ০.৫–০.৭ ট্রিলিয়ন টাকা
বাংলাদেশ: প্রায় ৭.৯ ট্রিলিয়ন টাকা
সিঙ্গাপুর: প্রায় ৮.৫–১১ ট্রিলিয়ন টাকা
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের বাজেট কাছাকাছি, এমনকি কখনো কখনো সিঙ্গাপুর বড়ও। কিন্তু এই তুলনা সরল অর্থে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয় না। কারণ বাজেট শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, বরং জনসংখ্যা, মাথাপিছু আয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিফলন।
সিঙ্গাপুর একটি উচ্চ আয়ভিত্তিক নগর-রাষ্ট্র। সেখানে অল্প জনসংখ্যার জন্য উচ্চমানের অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা হয়। ফলে মাথাপিছু ব্যয় অনেক বেশি।
মালদ্বীপ ১১০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি ঐদেশে কাজ করছে। সীমিত সম্পদ থাকলেও ছোট জনসংখ্যার কারণে মৌলিক সেবা পরিচালনা তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে জলবায়ু ঝুঁকি, আমদানি নির্ভরতা এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা তাদের বাজেট কাঠামোকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও জটিল। এখানে বাজেট কেবল উন্নয়ন নয়, বরং বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বৃহৎ প্রশাসনিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬–২৭: একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
ইতিবাচক দিক:
এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা ও সহায়তা সম্প্রসারণ একটি ইতিবাচক দিক। পাশাপাশি কিছু কর কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা দেখা যায়। অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে ধারাবাহিক ব্যয় বজায় রাখাও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
নেতিবাচক দিক:
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়া একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে থেকে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য স্পষ্ট ও জোরালো শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা এবং ঋণ নির্ভরতা ভবিষ্যতে চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য থাকলেও তার বাস্তব অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এই পার্থক্য বোঝার জন্য মাথাপিছু বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সিঙ্গাপুরে একজন নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় অনেক বেশি, ফলে জীবনমানও তুলনামূলকভাবে উচ্চ। মালদ্বীপে সীমিত বাজেট হলেও ছোট জনসংখ্যার কারণে মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিপুল জনসংখ্যার কারণে একই বাজেট অনেক বেশি মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, ফলে চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—বাজেটের আকার কখনোই রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি বোঝার জন্য দেখতে হয় সে তার সীমিত বা বিস্তৃত সম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছে। সিঙ্গাপুর সেই দক্ষতার প্রতীক। মালদ্বীপ সীমিত সম্পদের মধ্যে টিকে থাকার কৌশলের উদাহরণ। আর বাংলাদেশ বৃহৎ জনসংখ্যার মধ্যে উন্নয়ন ও ভারসাম্য রক্ষার এক চলমান চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত, এই তিনটি দেশের বাজেট আমাদের একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—রাষ্ট্রের অর্থনীতি শুধু অঙ্কের খেলা নয়, এটি বাস্তবতার প্রতিফলন। আর সেই বাস্তবতা বুঝতে হলে সংখ্যার পাশাপাশি কাঠামো, জনসংখ্যা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১১ জুন ২০২৬