কলিকালের কলধ্বনি ।। পর্ব ৫৩।। যুগস্রষ্টা এক অপরাজিতা জননেত্রীর বিদায়

কলিকালের কলধ্বনি ।। পর্ব ৫৩।।  যুগস্রষ্টা  এক অপরাজিতা  জননেত্রীর বিদায়

কলিকালের কলধ্বনি ।। পর্ব ৫৩।। 

 যুগস্রষ্টা এক অপরাজিতা জননেত্রীর বিদায়

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

বেগম খালেদা জিয়া (১৯৪৫-২০২৫)

রাজনীতিতে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের উপস্থিতিতে সময় নিজেই একটি রূপ পায়, বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন। তিনি কেবল একটি দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না, ছিলেন জনতার রায়ে উঠে আসা এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক। তাঁর বিদায় মানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান নয়; এটি আসলে ভোট, মাঠ ও সরাসরি জনসম্পৃক্ততার রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি। তাঁর চিরবিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে, আজ তাঁর বিদায়কে স্মরণ করা মানে—আমাদের রাজনীতির হারানো স্বরগুলোকে নতুন করে শোনা। তাই তাঁর শেষ বিদায়ে নিজের দলের কর্মি না হয়েও অনেকেই শোকাভিভূত।

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা কোনো পরিকল্পিত উত্তরাধিকার গল্প নয়। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর যখন বিএনপি কার্যত দিশাহীন, তখন দলীয় নেতাকর্মীদের অনুরোধেই তিনি সামনে আসেন। রাজনীতির পাঠশালা পেরিয়ে নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন চাপেই তাঁর উত্থান। নিতান্ত এক গৃহবধূ থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দলীয় ঐক্যের প্রতীক। এই রূপান্তরই তাঁকে সমসাময়িক অনেক নেতার চেয়ে আলাদা করেছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অবস্থান অনন্য। ১৯৯১ থেকে ২০০৮—এই সময়কালে পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয়ী হন। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা—ভূগোল বদলেছে, কিন্তু রায় বদলায়নি। শুধু জয় নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর ভোটের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; এটি তখনকার রাজনীতিতে ভোটারদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও আস্থার প্রমাণ।

১৯৯১ সালের নির্বাচন তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে দেয়। সামরিক শাসন-পরবর্তী বাংলাদেশে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট থাকে। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কখনোই মসৃণ ছিল না। আন্দোলন, সংঘাত, কারাবাস, ক্ষমতার পালাবদল—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক কঠিন পথচলা। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি অটল ছিলেন। এই সিদ্ধান্তকে কেউ নীতিগত দৃঢ়তা হিসেবে দেখেছেন, কেউ রাজনৈতিক ভুল হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অবস্থানের ফলে তিনি ধীরে ধীরে নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যান, যদিও জনমানসে তাঁর উপস্থিতি পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
তার প্রমাণ মিলেছে মৃত্যুর পরও। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখিয়েছে—মতাদর্শের বিভাজন সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ছিলেন উপেক্ষার বাইরে এক নাম। তাঁকে ঘিরে সমর্থন যেমন ছিল, তেমনি ছিল কঠোর সমালোচনাও। কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্বের জায়গায় তিনি ছিলেন অনিবার্য।

আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি যখন মব সন্ত্রাস, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা এবং জনসম্পৃক্ততার সংকটে জর্জরিত, তখন খালেদা জিয়ার সময়ের রাজনীতিকে ফিরে দেখা জরুরি হয়ে ওঠে। সেই সময়ের নির্বাচন ছিল প্রশ্নাতীত—এ দাবি কেউ করবে না। কিন্তু ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি ছিল, আর জনতার রায় ছিল দৃশ্যমান। খালেদা জিয়ার বিজয়গুলো সেই বাস্তবতারই অংশ।

তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক প্রজন্ম বিদায় নিল—যে প্রজন্ম রাজনীতিকে দেখত মাঠ, মিছিল আর ব্যালটের শক্তিতে। আজকের বাস্তবতায়, যেখানে প্রশাসন ও কৌশল অনেক সময় জনমতের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী, সেখানে খালেদা জিয়ার মতো নেতার উত্থান নতুন করে আর সম্ভব কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

খালেদা জিয়া ছিলেন অপরাজিতা—সব অর্থে নয়, কিন্তু জনতার রায়ে বারবার উত্তীর্ণ হওয়ার অর্থে। তাঁর সঙ্গে বিদায় নিল একটি যুগ, যেখানে রাজনীতির মাপকাঠি ছিল ভোটের বাক্স। তরুণবেলা থেকে তাঁকে নিয়ে যে কত লেখালেখি করাে হয়েছে তার হিসাব মনে নেই আজ। আর হয়তো এভাবে তাঁকে নিয়ে কলাম লেখা হবে না তেমন একটা। জনতার নেত্রীকে চিরবিদায়। তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ যেনো তাঁকে সম্মানিত একটি জায়গায় স্থান দেন- এ প্রার্থনা করি। আজকের এ কলাম তাই আজ শুধু শোকগাথা নয়; এটি আত্মসমালোচনারও ডাক। আমরা কী ধরনের রাজনীতি হারালাম, আর কোন পথে এগোচ্ছি, তাঁর নেতৃত্বের কি কি ভাল ভাল বৈশিষ্ট ছিল, আগামীর নেতারা কিভাবে কথা কম বলে, বেশি কাজ করবেন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হয়তো একজন যুগস্রষ্টা জননেত্রীর প্রতি সবচেয়ে সৎ শ্রদ্ধা।

লেখক : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫