খামেনি হত্যা: বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের ছাপ

খামেনি হত্যা: বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের ছাপ

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, লন্ডন, ১ মার্চ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির মৃত্যুকে ‘ইতিহাসের অন্যতম খারাপ মানুষের অবসান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্পের মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি খামেনির মৃত্যুকে শুধু ইরান নয়, বরং “মহান আমেরিকানদের জন্যও ন্যায়বিচার” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইইউ-র প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্তিমূলক। ইইউ পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস খামেনির মৃত্যুকে ইরানের ইতিহাসে ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে খামেনি পরবর্তী ইরানের রাজনৈতিক পথে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি ইরানি জনগণের জন্য স্বাধীনভাবে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগও তৈরি করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনও খামেনির অনুপস্থিতিকে একটি নতুন সুযোগ হিসেবে দেখেছেন, তবে তিনি চরম অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও জানিয়েছেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির মৃত্যুকে ‘নিষ্ঠুর ও নীতিহীন হত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবহেলা এবং মানবিক নৈতিকতার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। পুতিন খামেনিকে একজন ‘অসামান্য রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে স্মরণ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব হিসেবে খামেনির হত্যাকে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, একটি স্বাধীন দেশের নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা এবং শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের উসকানি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চীন ইরানের ওপর চলমান হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার এবং সংলাপে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ আগ্রাসন’ ও ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জঘন্য উদাহরণ’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

ধর্মীয় নেতা ও শান্তির পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠধারী পোপ লিও সব পক্ষকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে সময়মতো এই উন্মাদনা থামানো না গেলে অঞ্চলটি একটি ‘অপ্রতিরোধ্য অতল গহ্বরে’ পতিত হতে পারে। পোপ লিও বলেছেন, শান্তি কেবল যৌক্তিক, অকৃত্রিম এবং দায়িত্বশীল সংলাপের মাধ্যমে সম্ভব।

পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ওপর জোর দিয়েছে। তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হ্যালি মন্তব্য করেছেন, “খামেনির মৃত্যুতে কেউ শোক প্রকাশ করবে না।” ফরাসি সরকার মুখপাত্র মড ব্রেজঁ খামেনির শাসনের সময়কার হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী হিসেবে তাকে অভিহিত করেছেন এবং তার মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছেন।

ইতালি খামেনির মৃত্যুকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়’ হিসেবে দেখেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বলেছেন, এই উত্তরণকালীন পর্যায় কতদিন স্থায়ী হবে এবং চলমান সংঘাতে এর প্রভাব কতটা পড়বে তা নির্ধারণ করা কঠিন।

ভারতের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ হলেও দেশটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে। তবে শিয়া সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবরের প্রতিক্রিয়ায় জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভের উত্তাপ দেখা দিয়েছে। শ্রীনগরের লালচক বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র, যেখানে আমেরিকা ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তেহরানের এই পালাবদল কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমা শক্তি এটিকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হিসেবে দেখলেও রাশিয়া ও চীন এটিকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করছে।