“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬১।। ২০ লাখ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে ২০ কোটি জনগণকে
।। ২০ লাখ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে ২০ কোটি জনগণকে।।
উৎসর্গ:
সেই জনগণের প্রতি, যারা রাষ্ট্রের মালিক হয়েও রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাওয়ার অধিকারটুকু প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করে।

বাংলাদেশে এখন প্রায় ২০ কোটি মানুষের বসবাস। এদিকে সরকারী কর্মচারি প্রায় ১৯ লাখ। আর ধরা যাক ছোট বড় মিলিয়ে প্রাওয়ারফুল রাজনৈতিক নেতা হবে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ। এই ২০ লাখ জনগনই মূলত দেশের এই ২০ কোটি জনগনকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। মূলত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় অংশ ঘুরপাক খায় তুলনামূলকভাবে ছোট ২০ লাখ লোকের মধ্যে। সেই বাস্তবতা থেকেই প্রশ্ন উঠতে পারে—২০ লাখ মানুষ কি ২০ কোটি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দরজায় গিয়ে সেই জনগণকেই বারবার অনুমতি চাইতে হয়।
জন্মনিবন্ধন করতে হবে—অফিসে যেতে হবে।
জমির কাগজ করতে হবে—দপ্তরে যেতে হবে।
ব্যবসা করতে হবে—অনুমোদন নিতে হবে।
বাড়ি করতে হবে—নিয়ম মানতে হবে।
পাসপোর্ট, লাইসেন্স, কর, সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি সহায়তা—জীবনের অসংখ্য ক্ষেত্রে নাগরিককে কোনো না কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্র জনগণের জন্য তৈরি হলেও রাষ্ট্রের দরজায় দাঁড়ালে নাগরিক অনেক সময় নিজেকেই অসহায় মনে করেন।
এখানে আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো আধুনিক রাষ্ট্র প্রশাসন ছাড়া চলতে পারে না। দক্ষ কর্মকর্তা ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, ভূমি ব্যবস্থাপনা কিংবা নাগরিক সেবা পরিচালনা সম্ভব নয়।
সমস্যা আমলাতন্ত্রের অস্তিত্বে নয়।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেবা দেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতায় পরিণত হয়।
একজন সাধারণ নাগরিকের একটি ফাইল কোথায় আটকে আছে, তিনি জানেন না। কেন আটকে আছে, সেটিও জানেন না। কখন কাজ হবে, তার নিশ্চয়তাও নেই। অথচ ওই ফাইলের ওপর হয়তো তার ব্যবসা, চাকরি, জমি, বাড়ি কিংবা পারিবারিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
এভাবেই একটি ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়।
জাতীয় রাজনীতি থেকে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা কিংবা স্থানীয় সংগঠন—প্রতিটি স্তরে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী সক্রিয়। তাদের একটি অংশ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, অন্যরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করেন।
ফলে জনগণ শুধু প্রশাসনের মুখোমুখি নয়; অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার স্থানীয় কাঠামোর সঙ্গেও তাকে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে—একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় অধিকার কি কোনো ব্যক্তি, দল বা কর্মকর্তার অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করবে?
গণতন্ত্রের ধারণা বলছে, না।
একজন নাগরিক সরকারি সেবা পাবেন কারণ তিনি রাষ্ট্রের নাগরিক। কোনো কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত অনুগ্রহের কারণে নয়।
কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখতে পাই।
কোনো কাজ দ্রুত করতে ‘চেনাজানা’ লাগে। কোনো অফিসে যাওয়ার আগে পরিচিত কাউকে ফোন করতে হয়। কোনো সরকারি সেবা পেতে রাজনৈতিক পরিচয় কখনো সুবিধা তৈরি করে। আবার কোথাও কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়।
এভাবে নাগরিক অধিকার ধীরে ধীরে সুযোগ বা অনুগ্রহে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আর তখনই প্রশ্ন আসে—২০ কোটি মানুষের রাষ্ট্রে প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে?
ভোটের সময় জনগণ ক্ষমতার মালিক। তারা ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করেন। কিন্তু ভোটের পর প্রতিদিনের রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকে না।
জনপ্রতিনিধিরা নীতি নির্ধারণ করেন, আমলারা তা বাস্তবায়ন করেন, আর সাধারণ মানুষ সেই সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করেন।
এই ব্যবস্থায় জনগণের সবচেয়ে বড় দাবি হওয়া উচিত—জবাবদিহি।
একজন কর্মকর্তা যেমন জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন, তেমনি একজন জনপ্রতিনিধিও করবেন।
রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা সীমাহীন হতে পারে না। আমলাদের প্রশাসনিক ক্ষমতাও সীমাহীন হতে পারে না।
দুজনের ওপরই আইন, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
কারণ রাষ্ট্রে আমলা দরকার, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য দরকার নেই।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব দরকার, কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃত্বের নামে নাগরিকের অধিকার সংকুচিত করা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা।
অফিসে গিয়ে একজন নাগরিক যেন মনে না করেন তিনি কারও কাছে দয়া চাইতে এসেছেন।
একজন ব্যবসায়ী যেন অনুমোদনের জন্য কারও ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ওপর নির্ভর না করেন।
একজন কৃষক যেন ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বছরের পর বছর দপ্তরের পেছনে ছুটতে না হয়।
একজন তরুণ যেন চাকরি বা কোনো সরকারি সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয় ও সুপারিশকে যোগ্যতার বিকল্প মনে না করেন।
আর একজন সাধারণ মানুষ যেন মনে করতে পারেন—রাষ্ট্র তার ওপর নয়, তার জন্য।
২০ কোটি মানুষের দেশে ২০ লাখ মানুষ প্রশাসন ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে কাজ করতেই পারেন। সেটি কোনো সমস্যা নয়।
সমস্যা হলো, এই ২০ লাখ মানুষ যদি নিজেদের জনগণের মালিক ভাবতে শুরু করেন এবং ২০ কোটি মানুষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত জনগোষ্ঠী মনে করেন।
রাষ্ট্রের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই, যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তি নাগরিককে ভয় দেখান না; বরং নাগরিক জানেন—ক্ষমতাবান ব্যক্তিকেও আইনের কাছে জবাব দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই সংখ্যার নয়, ক্ষমতার চরিত্রের।
২০ লাখ মানুষ ২০ কোটি মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করবে—এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়।
২০ লাখ মানুষ ২০ কোটি মানুষের সেবা করবে—এটাই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চিত্র।
কারণ জনগণ রাষ্ট্রের বোঝা নয়।
জনগণই রাষ্ট্রের মালিক।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১ অক্টোবর, ২০২৬